ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল এখনো ঘোষিত হয়নি, তবে রাজশাহীর ৭২টি ইউনিয়নে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সক্রিয়তা এরই মধ্যে নির্বাচনি আবহ তৈরি করেছে। এই দৌড়ে সাংগঠনিকভাবে জামায়াতে ইসলামী বেশ এগিয়ে রয়েছে। দলটি তাদের অভ্যন্তরীণ প্রার্থী তালিকা প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে। অন্যদিকে, বিএনপি এখনো কোনো ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেনি, তবে প্রতিটি ইউনিয়নে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে নেমে গণসংযোগ ও প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
রাজশাহী জেলা জামায়াতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৭২টি ইউনিয়নের মধ্যে এরই মধ্যে ৬৮টিতে চেয়ারম্যান প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। বাকি চারটি ইউনিয়নেও খুব শিগগির নাম ঘোষণা করা হবে। এছাড়া রাজশাহী মহানগরীর আওতাধীন আটটি ইউনিয়নেও জামায়াতের প্রার্থীরা চূড়ান্ত হয়েছে। জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি গোলাম মুর্তূজা জানান, স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতেই এই প্রার্থী নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানীয় ইউনিয়নগুলোতে জামায়াতের প্রার্থীরা এরই মধ্যে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক প্রস্তুতিও গুছিয়ে আনছেন।
জামায়াতের স্থানীয় নেতা রফিকুল ইসলাম বকুল জানান, দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলার কারণেই প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর কারো ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মোহনপুর উপজেলা জামায়াতের আমির আব্দুল আওয়াল জানিয়েছেন, তাদের উপজেলায় ছয়টি ইউনিয়নেই প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে এবং প্রার্থীরা সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। দলটির লক্ষ্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে সংগঠনের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করা। এই আগ্রহকে সাংগঠনিক শক্তিতে রূপ দেওয়া গেলে ইউনিয়ন পর্যায়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলা সম্ভব।
অন্যদিকে বিএনপির চিত্র কিছুটা ভিন্ন। দলটির রাজশাহী জেলা আহ্বায়ক আবু সাইদ চাঁদ জানিয়েছেন, গত মাসেই সংশ্লিষ্ট থানার কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিটি ইউনিয়নে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই প্রক্রিয়া এখন চলমান রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। জেলায় প্রতিটি ইউনিয়নেই সম্ভাব্য প্রার্থীর ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, কোনো কোনো এলাকায় চেয়ারম্যান পদে ৭ থেকে ১২ জন পর্যন্ত নেতা নিজেদের জনপ্রিয়তা জাহির করার চেষ্টা করছেন।
বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকা নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও, দলটির নেতাদের দাবি, এটি কোনো দুর্বলতা নয়। বরং দীর্ঘদিন পর নির্বাচনি মাঠে ফেরায় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা দিয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা সভা, সমাবেশ ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ বাড়িয়ে নীতিনির্ধারকদের নজরে আসার চেষ্টা করছেন। স্থানীয় নেতা আব্দুস সালাম ও মিজানুর রহমান মনে করেন, দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত হলে তখন মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্বরূপ স্পষ্ট হবে। ফলে চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাইয়ে ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কেবল অর্থনৈতিক সক্ষমতা বা ব্যক্তিগত প্রভাব নয়, বরং দলের প্রতি দীর্ঘদিনের ত্যাগ, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা এবং মামলা-হয়রানির শিকার হওয়ার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে বিএনপি। দলটির স্থানীয় নেতারা আশাবাদী যে, একক প্রার্থী চূড়ান্ত করার পর সকলকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব হবে। তবে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কারো বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই বলে হাইকমান্ড সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াত সাংগঠনিকভাবে প্রার্থী চূড়ান্ত করে এগিয়ে থাকলেও, বিএনপির মূল চ্যালেঞ্জ এখন একক প্রার্থী নির্ধারণ এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বজায় রাখা। একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীর মধ্যে প্রতিযোগিতা দীর্ঘায়িত হলে দলের ভেতরে বিভাজন তৈরির ঝুঁকি থাকে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সমন্বয় করে একক প্রার্থী ঘোষণা করতে পারলে বিএনপির তৃণমূল সংগঠন নির্বাচনি কাজে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশা করছেন তারা। তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেকেই কয়েক বছর ধরে দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন।
এখন পর্যন্ত নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা না হলেও, মূলত সব দলের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরই ৭২ ইউনিয়নের লড়াইয়ের প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে। দলগুলোর অভ্যন্তরীণ এই দৌড়ঝাঁপ এখন রাজশাহীর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ








