সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প ত্যাগ বাংলাদেশের কৌশলগত ভুল: হামিদুর রহমান আযাদ

প্রকাশ:

কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান ১৮ মিটার গভীরতাকে কাজে লাগিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সুবর্ণ সুযোগ থাকলেও, শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত ছিল দেশের জন্য একটি বড় কৌশলগত ভুল। তবে এসব যুক্তির আড়ালে মূলত আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি কাজ করেছে।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল সংলাপে এমন মন্তব্য করেন। ‘নেক্সাস ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিস’ কর্তৃক আয়োজিত ‘মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর: ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত পর্যালোচনা’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সোনাদিয়ার সেই মহাপরিকল্পনা পরিত্যক্ত হওয়ায় বাংলাদেশ আজ মাতারবাড়ী বন্দর নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হচ্ছে, যা প্রকারান্তরে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর শামিল।

সোনাদিয়া প্রকল্পের প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক কারণ

  • ২০০৯ সালে গৃহীত সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে ১৮ মিটার প্রাকৃতিক গভীরতা থাকায় বড় মাদার ভেসেল সরাসরি ভেড়ানোর সুবিধা ছিল।
  • ২০১৪ সালে চীন এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে চূড়ান্ত আগ্রহ প্রকাশ করলেও ভূ-রাজনৈতিক চাপে তৎকালীন সরকার প্রকল্পটি বাতিল করে।
  • প্রকল্প বাতিলের কারণ হিসেবে পরিবেশগত প্রভাব, কচ্ছপ ও পাখির আবাসস্থল রক্ষার দোহাই দেওয়া হলেও এর নেপথ্যে মূলত আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিই মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে।

হামিদুর রহমান আযাদ আরও বলেন, সোনাদিয়া বন্দরটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার সুযোগ পেত। কিন্তু আঞ্চলিক পরাশক্তির স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে দেশ তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্ভাবনাকে বিসর্জন দিয়েছে। মাতারবাড়ী প্রকল্পের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে তিনি জানান, শুরুতে এই স্থানটিকে গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়নি। বরং এটি ছিল ১২০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য একটি সহায়ক জেটি ও অবকাঠামো নির্মাণের বিশেষায়িত প্রকল্প। পরবর্তীতে সোনাদিয়া প্রকল্প থেকে সরে আসার পর একে গভীর সমুদ্রবন্দরে রূপান্তরের চেষ্টা চালানো হয়। ২০১৪ সালে চীন এ প্রকল্পে অর্থায়নে প্রস্তুত থাকলেও আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক পরাশক্তির চাপের কারণে তৎকালীন সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন থেকে সরে আসে বলে দাবি করেন তিনি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারত।

মাতারবাড়ী বনাম সোনাদিয়া: সক্ষমতার ব্যবধান

মাতারবাড়ী ও সোনাদিয়ার তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, সোনাদিয়ার ১৮ মিটার গভীরতার বিপরীতে মাতারবাড়ী বন্দরের ড্রাফট মাত্র ১৩ দশমিক ৪ মিটার। ফলে এই বন্দরটি সচল রাখতে নিয়মিত পলি অপসারণ ও নিরবচ্ছিন্ন ড্রেজিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে। যদিও বন্দর না থাকার চেয়ে মাতারবাড়ী বন্দর হওয়া ইতিবাচক, কিন্তু সোনাদিয়ার যে প্রাকৃতিক গভীরতা ছিল, তা মাতারবাড়ী দিয়ে কখনই পূরণযোগ্য নয়। জাতীয় স্বার্থের চেয়ে দলীয় রাজনীতি ও বিদেশি শক্তির এজেন্ডাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলেই দেশ আজ ভূ-অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সংকুচিত করে ফেলেছে বলে তিনি মনে করেন।

গোলটেবিল সংলাপের অন্যান্য অংশগ্রহণকারী

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নেক্সাস ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ হাসান নাসির। এতে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন সাবেক মেজর জেনারেল আমসা আমিন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুবি আমাতুল্লাহ, ড. সিব্বির মাহমুদ এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি শহিদুল ইসলামসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ। বক্তারা সকলে একযোগে দেশের ব্লু-ইকোনমি ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমুদ্রসীমার সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং কৌশলগত প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখার আহ্বান জানান।

শেয়ার করুন