সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: কেন অন্ধকারে ছিল দূতাবাস?

প্রকাশ:

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নাগরিকের ঘটনাটি ঘিরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রবল প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অথচ দেশটিতে প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত।

গত ১৪ই অক্টোবর সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে সে দেশের বার্তা সংস্থা ‘সৌদি প্রেস এজেন্সি’ নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির এবং সুইটি (সিঁথি) আক্তার নামের এই দুই বাংলাদেশির দণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ করে। এই ঘটনার পরদিন জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশের কন্স্যুলেট বিস্তারিত জানতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে কূটনৈতিক পত্র পাঠায়। এরপর ১৮ই অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়ার সাথে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। এছাড়া গত সোমবার জেদ্দায় সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তার সাথে বৈঠকে বাংলাদেশের কূটনীতিকরা জানতে চেয়েছেন, কেন দণ্ড কার্যকরের বিষয়টি আগে জানানো হয়নি। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে শিগগিরই বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছে সূত্রটি।

কূটনৈতিক সূত্রের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ১লা আগস্ট নজরুল ইসলাম ও তার পরের দিন সুইটি আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ৩০শে সেপ্টেম্বর সৌদি কর্তৃপক্ষ জেদ্দায় বাংলাদেশ কন্স্যুলেটে বন্দিদের একটি তালিকা পাঠিয়েছিল, যেখানে এই দুজনের নাম ছিল। তালিকায় নজরুলের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ এবং সুইটির বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগের উল্লেখ থাকলেও তাদের সাজা সম্পর্কে কিছুই জানানো হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, তালিকার বিষয়টি জানা থাকলেও চূড়ান্ত সাজার খবর ছিল তাদের অগোচরে। অথচ বন্দিদের তালিকায় নাম ও অপরাধের বিবরণ থাকার পরও সংশ্লিষ্ট মিশন কেন আইনি নজরদারি বা মামলার অগ্রগতি জানতে তৎপর হয়নি, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির স্বীকার করেছেন যে, এই ঘটনায় তথ্য আদান-প্রদান ও কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগের ঘাটতি ছিল। তিনি সাংবাদিকদের জানান, অভিযোগের ধরণ উল্লেখ করে এভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক এবং সরকার এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও তথ্য চেয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে পুনরায় চিঠি পাঠিয়েছে। এদিকে কন্স্যুলেটের ১৮ই অক্টোবরের এক গোপনীয় স্মারকলিপিতে দাবি করা হয়েছে, নজরুলের পরিবার বা সুইটি আক্তারের পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি সহায়তা চেয়ে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়েছে, সৌদি আদালত দোভাষীর ব্যবস্থা রাখলেও আসামিরা পছন্দমতো দোভাষী বেছে নিতে পারেন না এবং দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সাথে মৃত্যুদণ্ডের সাজার সম্পর্কের কোনো ব্যাখ্যাও সেখানে দেয়া হয়নি। নজরুলের পরিবার জানিয়েছে, ছেলের গ্রেপ্তারের খবর তারা তখনই জানতে পারে। তার সঙ্গে সপ্তাহে একবার পরিবারের সদস্যদের কথা হতো। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই স্মারকলিপিতে বলা হয়, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের দূতাবাস কিংবা কন্স্যুলেটকে কিছু জানায়নি।

সৌদি আরবের বিচারপদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল একটি সূত্রের মতে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের মিশনকে লিখিতভাবে জানানোর অলিখিত নিয়ম রয়েছে। নজরুল ও সুইটির ক্ষেত্রে নিয়মটি মানা হয়েছিল কিনা, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু তালিকায় নাম থাকা যথেষ্ট নয়, বরং মামলার বিচারপ্রক্রিয়া, আদালতের রায় ও আপিলের সুযোগ সম্পর্কে খোঁজ রাখা দূতাবাসের অন্যতম দায়িত্ব। এছাড়া দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালে গণমাধ্যমের খবরে কয়েকজন বাংলাদেশির দোভাষী হিসেবে কাজ করার তথ্য উঠে এলেও, মিশনের নজরে বিষয়টি কেন আসলো না, সেটি এখন বড় আলোচনার বিষয়। পরিবারের এই বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকা এবং গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত দুই বাংলাদেশির মামলা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট মিশন কীভাবে অন্ধকারে থাকলো। মামলার অবস্থা, আদালতের কার্যক্রম, দণ্ডের ধরন এবং আপিলের সুযোগ সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ রাখাও কন্স্যুলার দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিম্ন আদালতে সাজার পর ১৩ বিচারকের প্যানেল তাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং নিয়ম মেনেই তা কার্যকর করা হয়েছে। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, যদি সৌদি কর্তৃপক্ষ আগেই বিষয়টি জানাতো, তবে মিশন তাদের আইনি সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ পেত। এ বিষয়ে সৌদি পক্ষ কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। উল্লেখ্য যে, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে বাংলাদেশের বন্দি হস্তান্তর চুক্তি থাকলেও সৌদি আরবের সাথে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর চুক্তি নেই। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ঈসা বিন ইউসুফ আল-দুহাইলানের সাথে বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে বিচারিক সহযোগিতার বিষয়ে চুক্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, কিন্তু সেই প্রক্রিয়া এখনো আলোর মুখ দেখেনি। সৌদি আরবের সঙ্গে বন্দি হস্তান্তর চুক্তি নেই বাংলাদেশের: স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সৌদি আরবের সঙ্গে বন্দি হস্তান্তর চুক্তি করেনি বাংলাদেশ। বিদেশে দণ্ডিত নাগরিকদের প্রত্যাবাসন ও আইনি সহযোগিতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভারতের সঙ্গে ২০১০ সালে এবং আমিরাতের সঙ্গে ২০১৪ সালে এ চুক্তি হয়।

শেয়ার করুন