২৯ বছরেও থমকে আছে লক্ষ্মীপুর বিসিকের শিল্পায়ন

প্রকাশ:

শিল্পায়নের মাধ্যমে স্থানীয় বেকারত্ব দূর করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের স্বপ্ন নিয়ে ১৯৯৭ সালে লক্ষ্মীপুর পৌর শহরের বাঞ্চানগর এলাকায় ১৬ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছিল বিসিক শিল্পনগরী। কিন্তু দীর্ঘ ২৯ বছর পেরিয়ে গেলেও নানা অব্যবস্থাপনা এবং মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে প্রতিষ্ঠানটি তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি। গ্যাস ও পানির তীব্র সংকট, নিয়মিত লোডশেডিং, বেহাল সড়ক, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত দুর্বলতার কারণে অনেক উদ্যোক্তা প্লট বরাদ্দ নিয়েও কারখানা চালু করতে সাহস পাচ্ছেন না। শুধু সড়ক নয়, ড্রেনেজব্যবস্থার অবস্থাও নাজুক।

শিল্পনগরীটির বর্তমান চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। ২০০০ সাল থেকে এখানে প্লট বরাদ্দ প্রক্রিয়া শুরু হয়। তিন দফায় ৫৪টি শিল্প ইউনিটের জন্য ৯৯টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও বর্তমানে মাত্র ৩০টির মতো ইউনিট সচল রয়েছে। তবে এই সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠানও পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। এখানে অয়েল মিল, বেকারি, চকলেট উৎপাদন, সয়াবিন প্রক্রিয়াকরণ, অটো রাইস মিল এবং মবিল রিপ্যাকিংসহ নানা ধরনের শিল্প ইউনিট থাকলেও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে উদ্যোক্তারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

লক্ষ্মীপুর-রায়পুর আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এই শিল্পনগরীটির কোনো প্রধান ফটক বা সীমানা প্রাচীর নেই, যার ফলে বাইরে থেকে এর অস্তিত্ব বোঝাই দায়। ভেতরে প্রবেশ করলেই দেখা যায় ভাঙাচোরা সড়কের করুণ দশা। অসংখ্য গর্ত ও খানাখন্দে ভরা রাস্তায় মালামাল পরিবহন করতে গিয়ে ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানগুলো প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়ছে। মিতালি বেকারির কর্মচারী আবদুল কুদ্দুস জানান, যাতায়াত ব্যবস্থার এমন ভয়াবহ অবস্থার কারণে ব্যবসায়ীরা নিয়মিত ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। স্বল্পমেয়াদী সংস্কার কাজ করা হলেও তা টেকসই হয় না, ফলে ভোগান্তি থেকেই যাচ্ছে। ছোট-বড় অসংখ্য খানাখন্দে ভরা সড়ক দিয়ে মালামাল পরিবহনের সময় ট্রাক, পিকআপসহ অন্যান্য যানবাহনকে চলতে হয় হেলেদুলে। সড়কের কিছু অংশে নিম্নমানের সংস্কার করা হলেও কিছুদিন পর আবার ভেঙে যায়। একটি কারখানা থেকে আরেকটি কারখানায় মালামাল পরিবহন করতেও আমাদের অনেক অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়।

ড্রেনেজ ব্যবস্থার নাজুক অবস্থা উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ড্রেনগুলোতে ময়লা-আবর্জনা জমে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে গেছে, যা মশা-মাছির উপদ্রব ও জীবাণু ছড়ানোর উৎস হয়ে উঠেছে। সামান্য বৃষ্টিতেই শিল্পনগরীর বিভিন্ন অংশ জলমগ্ন হয়ে পড়ে। ভাইয়া গ্রুপের অ্যাডমিন বেলাল হোসেন অভিযোগ করেন, বড় এই শিল্পনগরীর ড্রেনেজ ও যাতায়াত ব্যবস্থার এই বেহাল দশা কোনোভাবেই কাম্য নয়। জমে থাকা পানিতে পয়োনিষ্কাশনের অভাব জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।

সীমানা প্রাচীর না থাকায় নিরাপত্তাকর্মীর অনুপস্থিতিতে চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের আশঙ্কা সবসময়ই বিরাজ করছে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আব্দুর রহমান নামের এক কারখানা মালিকের মতে, শিল্পনগরীর অব্যবস্থাপনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কাঁচামাল আনা ও উৎপাদিত পণ্য পরিবহনে চরম বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে তাদের। একই সঙ্গে ড্রেনেজব্যবস্থাও খুব খারাপ।

উদ্যোক্তারা মনে করছেন, এই অঞ্চলে সস্তা শ্রম সহজলভ্য এবং দেশের ২১টি জেলার সঙ্গে উন্নত যোগাযোগের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র প্রশাসনিক উদাসীনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে শিল্পনগরীটি তার সম্ভাবনা হারাচ্ছে। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের বিশাল সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে এই অঞ্চলটি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হতে পারত। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই অঞ্চলে সস্তা শ্রম এবং দেশের ২১ জেলার সঙ্গে সহজ যোগাযোগের সুযোগ বিদ্যমান।

এদিকে বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা জুয়েল চৌধুরী স্বীকার করেছেন যে অনেক সমস্যা রয়ে গেছে। তবে তিনি দাবি করেন, সমস্যা সমাধানে ইতোমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জুয়েল চৌধুরী জানান, একটি প্রধান ফটক নির্মাণের জন্য আবেদন করা হয়েছে এবং নিজস্ব ডাম্পিং ইয়ার্ডের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া পৌরসভা থেকে ড্রেন নির্মাণের কাজ শেষের দিকে এবং সড়কবাতি স্থাপনের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। সিকিউরিটি গার্ডের জন্য আমরা আবেদন করেছি।

তিনি আরো জানান, আগামী দুই অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত প্রাক্কলন বাস্তবায়ন হলে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর উল্লেখযোগ্য সমাধান পাওয়া যাবে। তিনি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করে বলেন, আমরা নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে আসছি এবং যেসব উদ্যোক্তা এখনো কারখানা চালু করতে পারেননি, তাদের দ্রুত কাজ শুরু করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে এই শিল্পনগরীটি লক্ষ্মীপুরের অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। আমরা উদ্যোক্তাদের পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে আসছি, যাতে তারা শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে পারেন।

শেয়ার করুন