ফ্যাশনের দুনিয়ায় ফুল, পাতা কিংবা জ্যামিতিক নকশার ব্যবহার দীর্ঘদিনের। তবে বর্তমানে পোশাকের নকশায় প্রকৃতির উপস্থিতি যেন নতুন এক মাত্রা পেয়েছে। পোশাকের গলার কাজ, হাতা কিংবা পুরো কাপড় জুড়ে এখন ফুটে উঠছে মাছ, ময়ূর, বাঘ, পাখি, বিড়াল কিংবা প্রজাপতির মতো প্রাণীদের অবয়ব। এসব মোটিফ কখনো মূর্ত, আবার কখনো বিমূর্ত আকারে পোশাককে করে তুলছে অনন্য।
ডিজাইনাররা তাদের চারপাশে দেখা পরিচিত পরিবেশ, ব্যক্তিগত ভ্রমণ অভিজ্ঞতা কিংবা কোনো প্রাণীর বৈশিষ্ট্য থেকেই এই নকশার অনুপ্রেরণা পাচ্ছেন। যেমন, স্টুডিও নুভিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও ক্রিয়েটিভ হেড ফাতেমা তুজ জোহরা জানান, তার ডিজাইনের ভাবনা আসে দৈনন্দিন জীবন ও লোকশিল্প থেকে। তিনি বাস্তবধর্মী ছবি আঁকার চেয়ে প্রাণীটির নিজস্ব ভঙ্গি, শরীরের রেখা ও চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলতে বেশি আগ্রহী। তিনি মনে করেন, একটি ডিজাইনে বাঘ থাকলেই যে সেটিকে শক্তি বা সাহসের প্রতীক হতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। লোকজ প্রেক্ষাপট কিংবা প্রাণীর সহজাত সৌন্দর্যই অনেক সময় ডিজাইনের প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বিড়ালের কৌতূহলী ও স্বাধীন স্বভাবের কথা তুলে ধরেন, যা নকশায় আনন্দের আবহ তৈরি করতে পারে।
আবার ওয়্যারহাউস ব্র্যান্ডের কর্ণধার তাসনিম ফেরদৌস তার নকশায় কাকের ব্যবহার করেছেন নিজের বাড়ির বারান্দার পরিবেশ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। সাধারণ একটি পাখিকেও কীভাবে শৈল্পিকভাবে তুলে ধরা যায়, তা ছিল তার লক্ষ্য। এছাড়া সুন্দরবন ভ্রমণের অভিজ্ঞতার আলোকে তারা বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণীর মোটিফ নিয়ে কাজ করেছেন, যা কোনো বিচ্ছিন্ন ছবি নয় বরং একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের প্রতিফলন। এমনকি কচুরিপানার মতো সাধারণ বিষয়ও তাদের জ্যামিতিক প্রিন্টের অনুপ্রেরণা হয়েছে, যেখানে সরাসরি ছবি না এঁকে কচুরিপানার বিন্যাস ও অনুভূতির বিমূর্ত রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
নকশার উপস্থাপনায় ব্যবহৃত মাধ্যমের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফাতেমা তুজ জোহরা জানান, ডিজাইন, কাপড়ের ধরন ও কাঙ্ক্ষিত অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে তারা স্ক্রিন প্রিন্ট, ডিজিটাল প্রিন্ট, ব্লক প্রিন্ট কিংবা এমব্রয়ডারির মতো মাধ্যম নির্বাচন করেন। প্রতিটি মাধ্যমের আলাদা চরিত্র রয়েছে, যা মোটিফের আবেদনকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
পোশাকের নকশায় এই প্রাণ ও প্রকৃতিকে তুলে ধরার বিষয়টি শুধু নিছক ফ্যাশন নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ব্যক্তিগত স্মৃতি, পরিবেশ সচেতনতা এবং ঐতিহ্যের গল্প। প্রজাপতির স্মৃতিশক্তি সম্পর্কে যেমন ১০ বছরের শিশু জো জানতে চেয়েছিল, তেমনি প্রতিটি প্রাণীর মোটিফের পেছনে লুকিয়ে থাকে নতুন করে দেখার এক নান্দনিক সুযোগ। আজ কারিনা কাপুরের জন্মদিন উপলক্ষে তার জীবনের গল্প কিংবা জয়া আহসানের কলার মোচা দিয়ে ‘ক্রিসপি সালাদ’ বানানোর চিন্তার মতো নানা খবরের ভিড়ে পোশাকের এই শৈল্পিক বিবর্তন ফ্যাশনপ্রেমীদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। টাঙ্গাইলের পুরুষদের পোশাকের বাজারের মতো স্থানীয় পর্যায়ের নানা পরিবর্তনের পাশাপাশি পোশাকে প্রাণিজ মোটিফের এই ধারা আধুনিকতাকে আরও অর্থবহ করে তুলছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে ইদানীং ফ্যাশনের ক্যানভাসে প্রকৃতি যেন একটু অন্যভাবে হাজির হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাড়ির সামনের গাছ, জানালার পাশে বসে থাকা পাখি, পথে দেখা কোনো প্রাণী কিংবা ভ্রমণে চোখে পড়া দৃশ্যই হয়ে উঠছে পোশাকের নকশার অনুপ্রেরণা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাড়ির বারান্দার সামনে বড় কাঁঠালগাছটায় প্রতিদিন দল বেঁধে কাক আসে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যে পাখিটিকে সাধারণত মানুষ খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে দেখে না, সেটিকেই নকশার মাধ্যমে একটু আলাদা করে তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই প্রাণী ভিন্ন ডিজাইনারের কাছে ভিন্ন ভাবনা বহন করতে পারে, আবার কখনো কোনো প্রতীকী অর্থ ছাড়াই তার আকৃতি বা স্বভাবই হতে পারে নকশার মূল আকর্ষণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: টাঙ্গাইলে শুধু শাড়িই নয়, নীরবে গড়ে উঠেছে ছেলেদের পোশাকের বাজার।
সূত্র: প্রথম আলো








