১৬৫৬ সালে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের কাছ থেকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হুগলি নদীর পশ্চিম তীরে প্রথম কারখানা স্থাপনের রাজকীয় অনুমতি লাভ করে। এই অনুমোদনের সূত্র ধরে কোম্পানি বালাসোর, কাশিমবাজার ও পাটনায় তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বিস্তার করে। বাণিজ্যের আড়ালে এই কোম্পানি ১৬৮৬ সালে সুবেদার শায়েস্তা খানের আমলে বাংলার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের ষড়যন্ত্র শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৬৯০ সালে জোব চার্নক মাত্র ১৩০০ রুপির বিনিময়ে সুতানটি, গোবিন্দপুর ও দিহি-কালকুট্টা এই তিন গ্রাম নিয়ে প্রথম স্থায়ী ব্রিটিশ বসতি গড়ে তোলেন।
মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়লে বাংলা কার্যত স্বাধীন প্রদেশে পরিণত হয়। তবে নবাব আলিবর্দী খানের মৃত্যুর পর ১৭৫৬ সালে তরুণ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সিংহাসনে বসলে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ঘনীভূত হয়। কোম্পানি কর্মকর্তারা সিরাজের সেনাপতি মীর জাফর আলী খানের সঙ্গে গোপনে হাত মেলায়। এই বিশ্বাসঘাতকতার ফসল হিসেবে ১৭৫৭ সালের জুন মাসে পলাশীর প্রান্তরে নবাব বাহিনীর পরাজয় ঘটে। রবার্ট ক্লাইভ মীর জাফরকে বাংলার নতুন নবাব হিসেবে বসিয়ে কোম্পানি ও নিজের জন্য বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেন।
মীর জাফরের ওপর ব্রিটিশদের খবরদারি এবং অন্যায় দাবির ফলে দুই পক্ষের সম্পর্ক অবনতির দিকে যায়। নবাব তখন ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে গোপন আঁতাত গড়ে তোলায় ব্রিটিশরা ক্ষিপ্ত হয়। পরবর্তী সময়ে মীর কাশিম নবাব হিসেবে দায়িত্ব নিলে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অধিকার নিয়ে কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্বে জড়ান। মীর কাশিম যখন অন্য ইউরোপীয়দের ওপর থেকেও শুল্ক প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন, তখন ব্রিটিশ কোম্পানি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
এই ঘটনাপ্রবাহের সময়কালটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৭৬০ সালের দিকে ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের পর দেশটি শীর্ষস্থানীয় পুঁজিতান্ত্রিক শক্তিতে পরিণত হয়। ইতিহাসবিদ বিপান চন্দ্রের মতে, সেই সময়ে ব্রিটেন যখন চরম উন্নতির শিখরে আরোহণ করছিল, ঠিক তখনই ভারতবর্ষ অনুন্নয়ন ও পশ্চাৎপদতার চক্রে আটকা পড়তে শুরু করে। এই ঔপনিবেশিক রাজনীতির প্রভাব ভাষা, শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদে বিস্তার লাভ করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ৭। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই রাজকীয় অনুমোদনের ভিত্তিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, অল্প সময়ের ব্যবধানে, তার উড়িষ্যাস্থ বালাসোরের কারখানার সম্প্রসারণসহ বাংলা প্রদেশের কাশিমবাজার ও পাটনায় আরও দু’টি কারখানা স্থাপন করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইংরেজ বণিকরা যখন সম্রাট শাহজাহানের দরবারে ভারতে ‘কারখানা’ স্থাপনের অনুমতি প্রার্থনা করে, তখন ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর বিদ্রোহের ফলে মুঘল সাম্রাজ্য ভেতরের দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তথাপি, ব্রিটিশ বণিকরা দিল্লির সম্রাটের দরবারে অত্যন্ত বিনয়ী আচরণ প্রদর্শন করেছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ সময়কালে ভারতবর্ষের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ও তার প্রেক্ষিতে ইংরেজ বণিকদের আচরণ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর্যবেক্ষণ রীতিমতো প্রণিধানযোগ্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঠাকুর লিখেছেন, “[তখন] মোগল-সাম্রাজ্যের পতনোন্মুখ প্রবেশদ্বারে ইংরাজ বণিক সম্প্রদায় অত্যন্ত দীনভাবে দণ্ডায়মান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তখন ভারতক্ষেত্রে সংহারশক্তি যতপ্রকার বিচিত্র বেশে সঞ্চরণ করিয়া ফিরিতেছিল, তন্মধ্যে সর্বাপেক্ষা সাধু শান্ত ও দরিদ্র বেশ ছিল ইংরাজের। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মারাঠি অশ্বপৃষ্ঠে দিগ-দিগন্তরে কালানল জ্বালাইয়া ফিরিতেছিল, শিখ ভারতের পশ্চিম প্রান্তে আপন দুর্জয় শক্তিকে পুঞ্জীভূত করিয়া তুলিতেছিল, মোগল-সম্রাটের রাজপ্রতিনিধিগণ সেই যুগান্তরের সন্ধ্যাকালে ক্ষণে ক্ষণে বিদ্রোহের রক্তধ্বজা আন্দোলন করিতেছিল, কেবল কয়েকজন ইংরাজ। 29.
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “সিরাজদ্দৌলা”, প্রবন্ধ সমগ্র, পৃষ্ঠা: ৫৭৯
- Tirthankar Roy, The East India Company, p. ৮৯
- Bipan Chandra, ‘The Impact of British Rule’, Bipan Chandra and others, Freedom Struggle, p. 16-17
সূত্র: মানবজমিন








