দখলবাজি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সরকারের জন্য অশনিসংকেত: টিআইবি

প্রকাশ:

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত লুটপাট, ভাঙচুর ও জবরদখলের মতো ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি জানিয়েছে, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পুলিশের উপস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সহিংস দখলবাজি, কিশোরগঞ্জের জলমহাল নিয়ে স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে অর্ধশতাধিক আহতের ঘটনা এবং কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের কার্যালয় ভাঙচুরের মতো বিষয়গুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের জন্য অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই অনতিবিলম্বে এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। সেই সাথে দেশব্যাপী দলের ভেতর আত্মশুদ্ধি অভিযান চালানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিএনপির নীতি-নির্ধারকগণ দলীয় নেতাকর্মীদের উল্লেখযোগ্য অংশের চলমান দখলবাজি ও চাঁদাবাজির পরিণতি ভেবে দেখছেন কী। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তৃণমূলসহ বিভিন্ন পর্যায়ের দলটির অনেক নেতাকর্মী বেপরোয়া আচরণ শুরু করেন, যা গণমাধ্যম, পর্যবেক্ষক ও রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাড্ডা এমসিএইচ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যে ঘটনা ঘটেছে, তা অত্যন্ত বিব্রতকর। জাতীয় সংসদের একজন সংরক্ষিত আসনের সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতায় পুলিশের সামনেই অর্ধশত বছর ধরে মা ও শিশুদের সেবায় নিয়োজিত একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী চোরতন্ত্রের পতনের পর জনগণের রায়ে সরকার গঠন করা হলেও নেতাকর্মীদের এমন আচরণ দেশবাসীর কাছে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। অতীতের কর্তৃত্ববাদী সরকারের স্বেচ্ছাচারী আচরণের কথা সাধারণ মানুষের এখনো মনে আছে। এমতাবস্থায় বিএনপির নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে ভেবে দেখার সময় এসেছে। অন্তত নিকট অতীতের দৃষ্টান্ত সেটাই বলছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকেই বিএনপি নেতাকর্মীদের একাংশের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অভিযোগ উঠছে। ঢাকার সায়দাবাদ, গাবতলী ও মহাখালীসহ চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনার প্রধান বাস টার্মিনাল, ফুটপাত, বাজার, বালুমহাল, জলমহাল, ক্যাবল ইন্টারনেট সংযোগ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো খাতে দখলবাজির ঘটনা অনেকটা মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব দখল নিয়ে দলের ভেতরেই অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও সহিংসতা ঘটছে। একজন মন্ত্রী চাঁদাবাজিকে দুর্নীতি নয়, বরং সমঝোতার লেনদেন হিসেবে আখ্যায়িত করায় পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্যের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় এ ধরনের অপতৎপরতা বেড়েছে, যা বর্তমান সরকারের জন্য বড় সতর্কবার্তা। যা কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও অন্তর্ঘাত অনেক ক্ষেত্রে নির্লজ্জভাবে সহিংস রূপ ধারণ করছে।

কিশোরগঞ্জের জলমহাল দখল ও ক্রিয়েটিভ স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনাকে আগস্টের পর থেকে চলা ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতা বলে উল্লেখ করেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারের সব ভালো উদ্যোগ ও সদিচ্ছাকে ম্লান করে দিচ্ছে। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী দুর্নীতি দমনে এখনই কার্যকর আত্মশুদ্ধিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে, অদূর ভবিষ্যতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। অতীতেও এমন দৃষ্টান্ত দেখা গেছে যেখানে শক্ত হাতে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী দমন করা সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে সরকারি দল যদি তাদের দুর্নীতিবিরোধী নির্বাচনী অঙ্গীকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে এখনই কার্যকর আত্মশুদ্ধিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই দখলবাজি ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রনের আর সুযোগ বা ক্ষমতা তারা চাইলেও পাবেন না।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দলীয়ভাবে মাঝে মাঝে বহিষ্কারের মতো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। কঠোর প্রতিরোধমূলক কৌশলের অভাব এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও অনেক সময় ব্যবস্থা নিতে পারছে না। ফলে দেশে অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি আবারও শেকড় গাড়ছে, যার সব দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে প্রতিটি ঘটনার যথাযথ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। বিবৃতিতে বলা হয়, ক্ষেত্র বিশেষে দলীয় নেতা-কর্মীদের এ ধরনের অপতৎপরতায় উচ্চ পর্যায় থেকে বিব্রতবোধ থেকে বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যেবস্থা গৃহীত হলেও একদিকে কঠোরতর প্রতিরোধমূলক কৌশলের ঘাটতি ও অন্যদিকে ক্ষমতার অপব্যবহারের এ সব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের মূলত সরকারি দলের সঙ্গে।

শেয়ার করুন