শয্যার চেয়ে আড়াই গুণ বেশি রোগী

প্রকাশ:

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ১ কোটি মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল। ১৯৬৮ সালে মাত্র ২৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই হাসপাতাল বর্তমানে ১ হাজার শয্যায় উন্নীত হলেও সেবার মান ও অবকাঠামোর বিচারে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বর্তমানে হাসপাতালটি পরিচালনার জন্য যে জনবলকাঠামো ব্যবহৃত হচ্ছে, তা মূলত ৫০০ শয্যার সময়ের। ফলে শয্যার তুলনায় আড়াই গুণ বেশি রোগী সামলাতে গিয়ে চিকিৎসক ও কর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘এমনিতেই জ্বরে কাহিল। অবশ্য শয্যা না পাওয়া নিয়ে তাঁর আক্ষেপ নেই।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হাসপাতালটিতে প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে ৪ হাজার এবং সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার রোগী সেবা নেন। এর মধ্যে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার রোগী ভর্তি থাকছেন। অথচ চিকিৎসক ও সহায়ক কর্মীর পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে। হাসপাতালের বর্তমান জনবলকাঠামো অনুযায়ী ৩২৩টি চিকিৎসকের পদের মধ্যে ২২৯ জন কর্মরত থাকলেও ৯৪টি পদ শূন্য। এ ছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণির ৫৯৭টি পদের মধ্যে ২৮২টি, তৃতীয় শ্রেণির ১৮৩টির মধ্যে ৬৬টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ৪১৪টি পদের মধ্যে ২১৬টি পদ খালি রয়েছে। বহির্বিভাগের চিত্র আরও করুণ; গড়ে ৪ হাজার রোগীর বিপরীতে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ৫৩ জন, যার অর্থ প্রতিটি চিকিৎসককে প্রতিদিন গড়ে ৭৫ জন রোগী দেখতে হয়।

হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক দুর্গা প্রসাদ সরকার জানান, সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত সিনিয়র চিকিৎসকরা দায়িত্ব পালন করলেও এরপর পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা কেবল ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ওপরই নির্ভর করতে হয়। জনবল সংকটের এই প্রভাব পড়েছে ট্রলি ও হুইলচেয়ার পরিষেবায়। জরুরি বিভাগে রোগী পরিবহনের জন্য অনুমোদিত ২১ জন ট্রলিম্যানের বিপরীতে বর্তমানে ১৯ জন কর্মরত আছেন। এর মধ্যে আবার দুজনকে অন্তর্বিভাগ সামলাতে হয়। ফলে স্বজনদের প্রায়ই নিজেদের ট্রলি ঠেলে রোগী বহন করতে হয়। গত ৫ অক্টোবর রামিন হোসেন নামের এক স্বজন তাঁর স্ট্রোক করা দাদাকে হাসপাতালে আনার পর ট্রলি না পেয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকের সহায়তায় কোলে করে ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানান। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় হাসপাতালে কথা হয় আবদুস সালামের সঙ্গে।

হাসপাতালের শৌচাগারগুলোর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও দুর্গন্ধ নিয়ে রোগীদের চরম ভোগান্তি রয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হওয়া বেলাল হোসেন জানান, শয্যা না পেয়ে বারান্দার মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হলেও শৌচাগারের দুরবস্থা সহ্য করা কঠিন। হাসপাতালের পুরোনো ভবন ও নতুন ভবনে ভর্তি হওয়া রোগীদের ওয়ার্ডের মেঝে বা বারান্দাতেও জায়গা মিলছে না। আবদুস সালাম নামের ৭০ বছর বয়সী এক রোগী বরগুনা থেকে জ্বর নিয়ে এসে শয্যা না পেয়ে বারান্দার মেঝেতেই আশ্রয় নিয়েছেন। জ্বর নিয়ন্ত্রণে না আসায় ৭০ বছর বয়সী এই ব্যক্তি গত রোববার বিকেলে বরগুনা থেকে বরিশালে আসেন। তিনিও শয্যা না পেয়ে একই ভবনের বারান্দার মেঝেতে বিছানা পেতেছেন। তবে বেলাল হোসেন বলেন, হাসপাতালের শৌচাগারগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। দুর্গন্ধ ও নোংরার কারণে ব্যবহারের অনুপযোগী।

বিদ্যুৎ সংকট নতুন ভবনটির কার্যক্রমকে আরও ব্যাহত করছে। দিনে-রাতে সাত থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় লিফট, ফ্যান ও বাতি বন্ধ হয়ে যায়। সেখানে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ রোগী ভর্তি থাকেন। জেনারেটর থাকলেও ডিজেল সংকটের কারণে তা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে; জেনারেটর চালাতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১১০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে অস্ত্রোপচারের সংখ্যা দৈনিক ২০-২৫টি থেকে কমে ১০-১২টিতে নেমে এসেছে।

বিশেষায়িত সেবার দিক থেকে হাসপাতালটি অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এখানে ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন (সিসিএম) ইউনিট না থাকায় সংকটাপন্ন রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। আইসিইউ ও সিসিইউ সুবিধা থাকলেও ক্যাথল্যাব না থাকায় হৃদরোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা বা অন্য জায়গায় যেতে হয়। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর স্বীকার করেছেন যে, পুরোনো অবকাঠামো ও জনবল সংকটের মধ্যেও তাঁরা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই সংকটগুলো নিরসনের লক্ষ্যে তাঁরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং নতুন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও জেনারেটরের জন্য জ্বালানি বরাদ্দ চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন।

শেয়ার করুন