উত্তরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য হৃদ্রোগের মানসম্মত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে টিএমএসএস হার্ট সেন্টার। প্রতিষ্ঠানের উপনির্বাহী পরিচালক ও হেলথ সেক্টরের প্রধান ডা. মো. মতিউর রহমান জানান, ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশনের এবারের প্রতিপাদ্য ‘ডোন্ট মিস আ বিট’-এর মর্মার্থ অনুধাবন করে তারা প্রতিটি হৃৎস্পন্দন রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিচ্ছেন। অনেক সময় হৃদ্রোগের লক্ষণগুলো দীর্ঘস্থায়ী ও অস্পষ্ট থাকে, যা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অভাবে ধরা পড়ে না। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বগুড়ায় নিজস্ব প্রতিবেদক আনোয়ার পারভেজ। ছোট একটি বাক্য, কিন্তু এর তাৎপর্য অনেক। মতিউর রহমান: প্রতিরোধের জায়গায় সচেতনতার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
ডা. মতিউর রহমান সতর্ক করে বলেন, হৃদ্রোগ অনেক ক্ষেত্রে কোনো আগাম সংকেত ছাড়াই হানা দেয়। অস্বাভাবিক ক্লান্তি, সামান্য পরিশ্রমে হাঁপিয়ে যাওয়া, পা ফুলে যাওয়া, পিঠ বা চোয়ালে ব্যথা, ঠান্ডা ঘাম এবং অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন হৃদ্রোগের অন্যতম লক্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, ডায়াবেটিস রোগী এবং নারীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় সাধারণ লক্ষণগুলো অনুপস্থিত থাকতে পারে। তাই রক্তচাপ, রক্তের শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়মিত পরীক্ষা করা অপরিহার্য। উচ্চ রক্তচাপ হৃদ্রোগের বড় ঝুঁকি, যা কোনো উপসর্গ ছাড়াই নীরবে শরীরের ক্ষতি করতে থাকে। সমস্যা হলো, অনেক মানুষ নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে জানে না।
বাংলাদেশে বর্তমানে অসংক্রামক রোগের ভয়াবহতা বাড়ছে, যার মধ্যে হৃদ্রোগ শীর্ষে। প্রতিবছর দেশে প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ জন মানুষ হৃদ্রোগ ও এর সংশ্লিষ্ট জটিলতায় প্রাণ হারান। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তের হার ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ডায়াবেটিসে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং উচ্চ কোলেস্টেরলের হার ৩০ দশমিক ২ শতাংশ। ডা. মতিউর রহমান জানান, অধিকাংশ মানুষই নিজেদের ঝুঁকির ব্যাপারে সচেতন নন এবং ওষুধ গ্রহণের পরও নিয়মিত ফলোআপ করেন না।
উত্তরাঞ্চলের রোগীদের জন্য হৃদ্রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা একটি বড় বাধা। অতীতে এই রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় যেতে হতো, যা জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। এই ঝুঁকি কমাতে টিএমএসএসের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগমের নেতৃত্বে টিএমএসএস হার্ট সেন্টারে এখন আধুনিক সব চিকিৎসা সেবা চালু করা হয়েছে। এর ফলে প্রান্তিক পর্যায়েও রক্তচাপ ও শর্করার মাত্রা পরিমাপের মাধ্যমে ঝুঁকি শনাক্ত করা সহজ হয়েছে। ফলে উত্তরাঞ্চলের রোগীদের ঢাকামুখী হওয়ার প্রয়োজন কিছুটা কমেছে।
চিকিৎসায় সচেতনতা বৃদ্ধির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি পরামর্শ দেন, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস, চিনি ও লবণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ, তামাকজাত পণ্য ও ই-সিগারেট বর্জন এবং পর্যাপ্ত ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপকে রুটিন সেবার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে আনার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
টিএমএসএস হার্ট সেন্টারের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বলতে গিয়ে ডা. মতিউর রহমান জানান, উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসার উচ্চ ব্যয় এবং দক্ষ বিশেষজ্ঞ জনবলের সংকট কাটিয়ে ওঠাই এখন প্রধান লক্ষ্য। দরিদ্র রোগীদের আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বিশেষায়িত চিকিৎসা পর্যন্ত একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করতে তারা কাজ করছেন। ভবিষ্যতে এই সেন্টারকে উত্তরাঞ্চলের হৃদ্রোগ চিকিৎসা, গবেষণা ও পুনর্বাসনের একটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রে রূপ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে তাদের। দীর্ঘদিন দেশের হৃদ্রোগ চিকিৎসার বড় অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে কার্ডিওলজি বহির্বিভাগ দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে বিশেষায়িত বিভিন্ন সেবা যুক্ত হয়েছে।
সূত্র: প্রথম আলো








