সৌদি আরামকোর প্রশাসনিক ভবনে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

প্রকাশ:

সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর পূর্বাঞ্চলীয় ধাহরান শহরের একটি প্রশাসনিক ভবনে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীরা। বুধবার সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবারের গভীর রাতে এই হামলার পরপরই কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ক্ষেপণাস্ত্রটি আরামকোর সদর দপ্তর কমপ্লেক্সের একটি অফিস টাওয়ারে আঘাত করলে ভবনটির ওপরের তিনটি তলায় আগুন ধরে যায়। তবে সৌভাগ্যবশত এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। আরামকোর ওই কমপ্লেক্সটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকেই কোম্পানিটির স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক তেল উত্তোলনকেন্দ্র, শোধনাগার, পাইপলাইন এবং রপ্তানি টার্মিনালের মতো বিশাল অবকাঠামো নেটওয়ার্ক তদারকি করা হয়। আরামকোর ওই কমপ্লেক্সে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচালনাকেন্দ্র আছে। এর আগে রয়টার্সকে ছয়টি সূত্র জানিয়েছিল, তারা আরামকোর কমপ্লেক্সের আশপাশে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, ধাহরানে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে ধ্বংস করা হয়েছে, যার ধ্বংসাবশেষ একটি আবাসিক এলাকায় পড়ে। পাশাপাশি রিয়াদ ও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের আকাশে একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে ধ্বংস করেছে জোট বাহিনী। সৌদি সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র জানান, রিয়াদে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ পড়ার কারণে ১৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এক শিশুসহ চারজন আহত হয়েছেন। হুতিদের মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি আগেই ধাহরানে আরামকোর সদর দপ্তর ও রিয়াদের তেল শোধনাগারসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, এতে রাজধানীর ১৫টি বাড়ি সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আহতদের মধ্যে দুজন নারী, একজন পুরুষ ও একটি শিশু রয়েছে। যেসব স্থাপনায় হামলা হতে পারে, সেগুলো থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে গোষ্ঠীটি।

ইয়েমেনের রাজধানী সানার উপকণ্ঠে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলা এবং সেখানে অবস্থিত ইয়েমেন পেট্রোলিয়াম কোম্পানির সাবাহ কেন্দ্রীয় জ্বালানি ডিপো ধ্বংসের প্রতিক্রিয়ায় হুতিরা এই হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে শনিবার রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত হন, যা গত এক দশকে সৌদিতে চালানো সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা। এই উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সৌদি মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে হুতিদের বারবার হামলার কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করা হয়েছিল। সৌদি আরবে তেলশিল্পে কর্মরত ব্যক্তিদেরও সতর্ক করেছে হুতিরা।

বর্তমানে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ নতুন মোড় নিয়েছে। গত মাসে হুতিদের দখল করা এলাকাগুলো পুনর্দখলে সরকারি বাহিনীকে সহায়তা করতে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে সৌদি আরব। বিশেষ করে লোহিত সাগরের বাব আল মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে রিয়াদের এই তৎপরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য এই পথটি কৌশলগতভাবে অপরিহার্য। ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে লোহিত সাগরে সংঘাত ও উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাব ইয়েমেনের এই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমেই এই বৃহত্তর সংঘাতের সূচনা হয়। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান হুতিদের সাথে রিয়াদের বিরোধ মীমাংসার জন্য মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি গত রবিবার এই প্রস্তাবের কথা জানান, যা সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আবারও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান মিত্র ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তাদাতা যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক যুদ্ধে জড়ানোর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

শেয়ার করুন