হুথিদের দমনে ইসরাইলি সামরিক সহায়তার প্রস্তাব নাকচ রিয়াদের

প্রকাশ:

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের মোকাবিলায় সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে ইসরাইলকে অন্তর্ভুক্ত করার একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে সৌদি যুবরাজ ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এই কূটনৈতিক প্রস্তাবটি রিয়াদের কাছে পৌঁছানো হয়েছিল।

কূটনৈতিক সূত্রের ভাষ্যমতে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এই সামরিক সহযোগিতার ঘোর বিরোধী। তার আশঙ্কা, ইসরাইলি বাহিনীর সাথে প্রকাশ্য সামরিক আঁতাত সৌদি জনগণের মাঝে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। তেল আবিব চেয়েছিল এই সামরিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করতে এবং ভবিষ্যতে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কের পথ সুগম করতে। তবে এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। একই সঙ্গে এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যতে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পথও তৈরি হতে পারে বলে আশা করেছিল ইসরাইল।

সৌদি আরব ও ইসরাইলের মধ্যে বর্তমানে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে সৌদি আরবকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এর উত্তরে রিয়াদ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া ইসরাইলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন করা অত্যন্ত কঠিন।

দীর্ঘদিন ধরেই নেতানিয়াহু সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। ২০২৩ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ওই বছরের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুরু হলে পুরো আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে নেতানিয়াহু সরকারের কঠোর অবস্থানের সঙ্গে সৌদি আরবের নীতিগত বিরোধ থাকায় সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়া থমকে আছে।

ইয়েমেনে হুথিদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটি বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। উল্লেখ্য যে, ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক অভিযান শুরু করে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে বড় ধরনের লড়াই কিছুটা স্তিমিত হয়েছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনা নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পর বড় ধরনের লড়াই অনেকটা কমে এলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবার উত্তেজনা বেড়েছে। এমন এক সময়ে ইসরাইলের প্রস্তাবের খবর সামনে এসেছে, যখন ইয়েমেনের হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সংঘাত চলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে ইসরাইলকে যুক্ত করার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসত। তবে যুবরাজের আপত্তির খবরটি স্পষ্ট করে যে, হুথিদের বিরুদ্ধে অভিন্ন স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও ইসরাইলের সঙ্গে প্রকাশ্য সামরিক সহযোগিতার রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে রিয়াদ এখনো নারাজ। বর্তমানে এই পুরো বিষয়টি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কূটনৈতিক সূত্রের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আলোচিত হচ্ছে, যার কোনো পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়নি।

শেয়ার করুন