যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের আবহে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক দমনে নতুন করে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে দেশের সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবস্থায় আরও বিধিনিষেধ আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান। দেশটির কর্তৃপক্ষের দাবি, স্টারলিংক এখন শত্রুপক্ষের তথ্য সংগ্রহ, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং দিকনির্দেশনার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের স্টারলিংক ইরান সরকারের কঠোর ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে অনলাইনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়। এ ছাড়া স্টারলিংক-সংশ্লিষ্ট ইন্টারনেট প্রটোকল স্থানীয় অ্যাপ ও সেবার সঙ্গে যুক্ত হলে সেগুলো শনাক্ত করা সম্ভব।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সাইবারস্পেস কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ আমিন আগামিরি স্টারলিংককে সরাসরি শত্রুদের যুদ্ধের অস্ত্র বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, স্টারলিংকের স্যাটেলাইট টার্মিনালগুলো নিষ্ক্রিয় করতে দেশটির হাতে বেশ কিছু কার্যকর প্রযুক্তি রয়েছে। আগামিরি স্পষ্ট করেন যে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতের সংকটময় পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে বিদ্যুৎ সরবরাহের মতো ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বাধ্যবাধকতাও তৈরি হতে পারে।
দেশটিতে স্টারলিংক সেবা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ধরনের টার্মিনাল বিতরণ বা ব্যবহারের দায়ে বড় অঙ্কের জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এমনকি কোনো ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা বা গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তির ঝুঁকিও রয়েছে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে ইন্টারনেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা হয়েছে। ২০২৬ সালে দেশটির প্রায় ৯ কোটি মানুষ দুইবার দীর্ঘ মেয়াদে ইন্টারনেট সংযোগহীনতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভের সময় টানা তিন সপ্তাহ এবং যুদ্ধের শুরুতে ৮৮ দিন বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৯ সালের দেশব্যাপী বিক্ষোভের সময় প্রথমবারের মতো এক সপ্তাহের জন্য ইন্টারনেট বন্ধ করতে হয়।
ইরান সরকার সাইবার হামলার হাত থেকে জাতীয় সম্পদ রক্ষার অজুহাতে ইন্টারনেট গতি ইচ্ছাকৃতভাবে কমানোর বিষয়টি স্বীকার করেছে। সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঝেমধ্যেই ইন্টারনেটের গতি নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, স্টারলিংকের সংযোগ ব্যাহত করতে ইরান সংকেত-বাধাদানকারী বা জ্যামার যন্ত্র ব্যবহার করে। এছাড়া নতুন টার্মিনাল সক্রিয় হওয়া রোধে জিপিএসের ভুয়া সংকেত ব্যবহার এবং ড্রোন ও টহলের মাধ্যমে টার্মিনালগুলো খুঁজে বের করার অভিযান নিয়মিত চলছে। টার্মিনাল আটকাতে টহল ও ড্রোন দিয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। যেসব স্থানে এসব যন্ত্র বিক্রি হয়, সেখানেও অভিযান চালায় কর্তৃপক্ষ।
২০২৩ সাল থেকে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের রেডিও রেগুলেশনস বোর্ডে স্টারলিংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে আসছে ইরান। গত ৪ অক্টোবর এই ইস্যুতে তেহরানে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা মূলত নরওয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কটির কার্যক্রমের জন্য দেশটিকে দায়ী করছে।
ইসরাইলের সাবেক রাজনীতিক নাফতালি বেনেটের গত জুনের এক দাবি অনুযায়ী, ২০২১-২২ সালে ক্ষমতায় থাকাকালীন ইসরাইল সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সহায়তার জন্য ইরানে হাজার হাজার স্টারলিংক যন্ত্র পাচার করেছিল। যদিও সেই যন্ত্রগুলোর সঠিক সংখ্যা এখনো রহস্য। গত জুনে ইসরাইলের রাজনীতিক নাফতালি বেনেট দাবি করেন, ২০২১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করতে ইরানে কয়েক হাজার স্টারলিংক যন্ত্র পাচার করেছিল ইসরাইল।
ইরানের উপপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোহাম্মদ হাফেজ হাকামির মতে, স্টারলিংকের ব্যাপক বিস্তার সরকারের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের হুমকি। ২০১৭-১৮ সালের বিক্ষোভ থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২০২৬ সালের অস্থিরতা পর্যন্ত সময়ে সরকার টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামের মতো সেবা একে একে বন্ধ করেছে। হাকামির সতর্কবার্তা, স্টারলিংকের ব্যবহার সরকারের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে না বলে এটি তাদের নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে অকার্যকর করে তুলছে।
মঙ্গলবার রাতে প্রকাশিত নতুন ইন্টারনেট নীতিমালা ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত এক নথিতে গুগল প্লে ও হোয়াটসঅ্যাপের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তবে ইউটিউব ও টেলিগ্রাম চালুর শর্ত হিসেবে সরকারের বেঁধে দেওয়া নীতিমালা মানার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে, যা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ক্ষীণ। সরকারি এই নথিটি প্রায় দুই বছর ধরে নিরাপত্তার খাতিরে গোপন রাখা হয়েছিল।
ভিপিএনসহ নানা বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করেও সাধারণ ইরানিরা ধীরগতি ও উচ্চমূল্যের ইন্টারনেটে অভ্যস্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে আগামী দিনগুলোতে ডিজিটাল নজরদারি ও ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতা আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ








