অচেনা সেলিব্রিটির প্রতি তীব্র আগ্রহ কেন তৈরি হয়?

প্রকাশ:

তুমি হয়তো কোনো গায়ক কিংবা অভিনেতার দারুণ ভক্ত। তাঁর নতুন গান কিংবা সিনেমা রিলিজের অপেক্ষায় থাকো। তিনি কী খাচ্ছেন, কোথায় ঘুরছেন বা কার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক—এই সব খুঁটিনাটি জানতে তোমার তীব্র আগ্রহ কাজ করে। এমনকি তারকাদের পারস্পরিক ঝগড়া নিয়েও তোমার অস্থিরতা বা কৌতূহল কম নয়। মজার ব্যাপার হলো, যাঁদের জীবনের এত খবর তুমি রাখছ, তাঁদের অনেকের সঙ্গেই তোমার বাস্তবে কখনো দেখা হয়নি। তাঁরা তোমাকে চেনেনও না, অথচ তাঁদের জীবনের ঘটনাগুলো তোমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি কী খান, কোথায় ঘুরতে যান, কার সঙ্গে ঘুরতে যাচ্ছেন—এসব জানতেও তোমার বেশ আগ্রহ। সহজ করে বললে, এমন একজন মানুষের সঙ্গে মনের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হওয়া, যিনি তোমাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না।

মনোবিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই এর কারণ অনুসন্ধান করছেন। বিদায়, ভালোমানুষ–আলোমানুষ আখতার হুসেন।

গবেষণায় দেখা যায়, কাউকে বারবার দেখলে বা তাঁর কথা নিয়মিত শুনলে আমাদের মনে এমন এক পরিচিতির অনুভূতি জন্মায়, যেন মানুষটি আমাদের খুব আপন।

ইউটিউবার বা ভ্লগারদের ভিডিও নিয়মিত দেখার ফলে তাঁদের কথা বলার ধরন, পছন্দ-অপছন্দ কিংবা মন খারাপের কারণগুলো দর্শকের কাছে পরিচিত মনে হয়। পরে জানলে, সে কোন খেলাটা পছন্দ করে, কোন খাবার খেতে ভালোবাসে, কোন বিষয়ে তার ভয় লাগে।

কয়েক মাস নিয়মিত ভিডিও দেখলে মনে হতে পারে, তুমি তাঁকে অনেক দিন ধরে চেনো। কিন্তু সেই ইউটিউবারের কাছে তোমার নাম বা অস্তিত্বের কোনো তথ্যই নেই। তোমাদের এই সম্পর্কটি সম্পূর্ণ একতরফা। তোমাদের মধ্যে বন্ধুত্বের মতো একটা অনুভূতি তৈরি হলেও সম্পর্কটা আসলে একতরফা।

মনোবিজ্ঞানে এই ধরনের সম্পর্ককে ‘প্যারাসোশ্যাল সম্পর্ক’ বা ছদ্ম-সামাজিক সম্পর্ক বলা হয়। ১৯৫০-এর দশকে গবেষক ডোনাল্ড হর্টন ও রিচার্ড ওল প্রথম এই ধারণাটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন। তাঁদের মতে, কোনো ব্যক্তিকে বারবার দেখলে তাঁর প্রতি পরিচিতিবোধ বাড়ে এবং তিনি নিজের কথা যত বেশি প্রকাশ করেন, ভক্তের মনে তাঁকে কাছের মানুষ মনে করার প্রবণতা তত প্রবল হয়। এ কারণেই তারকাদের ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার শুনতে বা পড়তে মানুষের এত ভালো লাগে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে বর্তমানে তারকারা আমাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছেন। আগে খবরের কাগজ বা ম্যাগাজিনের ওপর নির্ভর করতে হতো, কিন্তু এখন ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত তারকাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ফোনের পর্দায় ভেসে ওঠে। সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে পোষা প্রাণীর ছবি কিংবা বিদেশের ভ্রমণ—সবই শেয়ার করেন তাঁরা। কেউ নতুন প্রেমের কথা জানান, কেউ বিয়ের ঘোষণা দেন, আবার কেউ বা মনখারাপের কথা লিখে ভক্তদের সঙ্গে আবেগ ভাগ করে নেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রিয় অভিনেতা কী খেলেন, দুপুরে কোথায় গেলেন, ছুটিতে কার সঙ্গে ঘুরতে গেলেন, জন্মদিনে কী উপহার পেলেন—সবই হয়তো তুমি তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় দেখতে পাও। অ্যামেলিয়া এয়ারহার্টের নিখোঁজ–রহস্য সমাধানে ৮৯ বছর পর আবারও শুরু হচ্ছে অভিযান।

বাস্তব জীবনে মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরির প্রক্রিয়াটাও অনেকটা এরকম। নতুন বন্ধুর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর আমরা ধীরে ধীরে তার পছন্দ-অপছন্দ ও ভয়ের বিষয়গুলো জানতে পারি। নিজের কথা জানানোর মাধ্যমেই সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকারাও যখন নিজেদের জীবনের নানা দিক লাখ লাখ মানুষের কাছে তুলে ধরেন, তখন বিছানায় শুয়ে পোস্টটি দেখার সময় মনে হতে পারে তারকাটি যেন সরাসরি তোমার সঙ্গেই কথা বলছেন।

অবশ্য কাউকে বেশি দেখলেই যে সবসময় তাঁকে পছন্দ করতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অনেক সময় ভক্তরা প্রিয় তারকার ওপর বিরক্ত হয়ে সমালোচনা শুরু করেন। রেবেকা মার্ডন ও তাঁর সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক সাবেক ভক্ত একসময় কড়া সমালোচকে পরিণত হন। এই বিরক্তি সত্ত্বেও তাঁরা প্রিয় তারকাকে অনুসরণ করা ছাড়েন না, বরং নিয়মিত পোস্ট দেখে সমালোচনা করেন। অর্থাৎ কাউকে ঘনিষ্ঠ মনে করা আর কাউকে পছন্দ করা—দুটো ভিন্ন বিষয়।

ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও এই সম্পর্কের প্রভাব গভীর। তারকা বা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি যখন কোনো পণ্য বা বিষয়ের কথা বলেন, তখন ভক্তরা তা সহজেই গ্রহণ করেন। বিপণন গবেষক লরেন ল্যাব্রেক দেখিয়েছেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ব্র্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ যদি ব্যক্তিগত ও আন্তরিক মনে হয়, তবে গ্রাহকের আনুগত্য বেড়ে যায়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুব ভালোভাবেই জানে যে, প্রিয় মানুষটির পরামর্শে কিছু কেনার সম্ভাবনা সাধারণ বিজ্ঞাপনের চেয়ে অনেক বেশি। তাই ভক্তের মনোযোগকে ব্যবসায়িক কৌশলে রূপান্তর করা সহজ হয়।

অনেকে মনে করেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকাদের সবটুকু জীবনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এটি ভুল ধারণা। বাস্তবে তারা জীবনের খুব সামান্য অংশই প্রদর্শন করেন। তাঁর প্রতিদিনের সব কথা বা সত্যিকারের অনুভূতি আড়ালেই থাকে। তাই পর্দায় দেখা বিষয়টিকেই পূর্ণ সত্য বলে ধরে নেওয়া বোকামি। কোনো তারকার কথা শুনে কিছু কিনতে ইচ্ছা হলে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত, বিষয়টি সত্যিই প্রয়োজন কি না, নাকি কেবল প্রিয় তারকা ব্যবহার করছেন বলেই তা কেনা হচ্ছে। আগে যে ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি ছিল, তা কমে গেলে বা তারকার আচরণকে ব্যবসার কৌশল বলে মনে হলে এমনটা ঘটতে পারে।

শেষ পর্যন্ত তুমি কাকে অনুসরণ করবে, কার কথা শুনবে বা কোথায় সময় কাটাবে—সেটি একান্তই তোমার সিদ্ধান্ত। শুধু মনে রাখা জরুরি যে, তোমার এই সময় ও মনোযোগই অনেক প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যবসার জায়গা। তারকাদের বিয়ে, বিচ্ছেদ বা ব্যক্তিগত জীবনের খবরাখবর দেখা দোষের নয়, তবে এই একতরফা সম্পর্কে কতটুকু সময় ব্যয় করছ, তা খেয়াল রাখা প্রয়োজন। সর্বোপরি মনে রেখো, তুমি যাঁর জীবনের খবর এত আগ্রহ নিয়ে পড়ছ, তিনি হয়তো তোমার অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই জানেন না।

শেয়ার করুন