মায়ের হাত ধরে স্নাতকোত্তর, সংগ্রামের গল্প শোনালেন রাজিয়া

প্রকাশ:

রাজশাহীর পাঠানপাড়ার বাসিন্দা রাজিয়া সুলতানার পথচলা শুরু থেকেই ছিল চ্যালেঞ্জিং। ১৯৯৯ সালের ২৫ নভেম্বর জন্ম নেওয়া রাজিয়ার জীবনে আট বছর বয়স থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সঙ্গী হয়ে ওঠে। শুরুতে অন্যের সহায়তায় দাঁড়াতে পারলেও সময়ের সাথে সেই সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তিনি। বর্তমানে চলাফেরার প্রতিটি পদক্ষেপে তার একমাত্র অবলম্বন মা নাজনীন বেগম। সংসারের অভাব-অনটনের মাঝেও মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন মা, আর মেয়ে সেই লড়াইয়ে নিজেকে সামিল করেছেন অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে। তিনতলা বাড়ির দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে মেয়েকে নিয়ে ওঠানামা করতে করতে ক্লান্ত মা নাজনীন বেগম। বয়স বেড়েছে, শরীরেও আগের মতো শক্তি নেই। অথচ শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়ে রাজিয়া সুলতানাকে নিয়ে প্রতিদিনই চলে তাঁর এই সংগ্রাম। পরে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না হওয়ায় সেই সক্ষমতাও হারান।

রাজিয়ার শিক্ষাজীবনের যাত্রা শুরু হয় স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

পঞ্চম শ্রেণি পাসের পর শারীরিক অসুস্থতায় পড়াশোনা থমকে গেলেও নানার অনুপ্রেরণায় ফের শ্রেণিকক্ষে ফেরেন তিনি। ২০১৬ সালে রাজশাহী বহুমুখী বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০১৮ সালে রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন রাজিয়া। এরপর ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান তিনি। শুরুতে আরবি বিভাগে ভর্তি হলেও শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের দীর্ঘ সিঁড়ি মা নাজনীন বেগমের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে ওঠে। তাই মায়ের কষ্ট লাঘবে তিনি বিভাগ পরিবর্তনের আবেদন করেন এবং বাংলা বিভাগে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এই লম্বা পথ পাড়ি দেওয়া মোটেও সহজ ছিল না। ভারী বৃষ্টিপাতের দিনে মায়ের কোলে করে বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়ার সময় সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে রাজিয়া পড়ে গিয়ে পায়ে আঘাত পান, যার ফলে একটি পরীক্ষায় অংশ নেওয়াও সম্ভব হয়নি তার। বাড়ির দোতলায় থাকার কারণে প্রতিদিন সিঁড়ি ভাঙা তাদের জীবনের নিত্যদিনের রুটিনে পরিণত হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের কাছে নিচতলার একটি কক্ষ বিনিময়ের অনুরোধ করেও সাড়া মেলেনি, কারণ চাচা আমিনুল ইসলাম নিচতলায় দোকান ব্যবসার স্থান ছাড়তে নারাজ। ফলে নিচতলার তিনটি কক্ষের সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাজিয়া ও তার পরিবার।

রাজিয়ার বাবা হাফিজুর রহমান একটি নির্মাণ সংস্থায় নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন এবং ছোট ভাই ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। সকল বাধা ডিঙিয়ে রাজিয়া ২০২৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। এখন তার লক্ষ্য সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। কিন্তু প্রতিবন্ধকতার কারণে কোনো কোচিং সেন্টারে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দিন দিন মা নাজনীন বেগমের শরীর ভেঙে পড়ছে, তবুও মেয়ের স্বপ্নপূরণে তিনি এখনো হাল ছাড়েননি। মেয়েও স্বপ্ন দেখেন, একদিন চাকরি পাওয়ার পর মায়ের এই দীর্ঘদিনের সংগ্রামের সান্ত্বনা হিসেবে একটু স্বস্তির জীবন উপহার দেবেন। এখন মেয়ের চাওয়া, চাকরি করে বাকি জীবন মাকে যদি একটু স্বস্তিতে রাখতে পারেন। প্রায় সারা দিন তাঁকে সেখানে থাকতে হয়।

শেয়ার করুন