নামাজ নিয়ে মন্তব্যে বিপাকে বাগেরহাটের প্রধান শিক্ষক

প্রকাশ:

বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার শিরিন হক পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায়ের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। স্কুলে আয়োজিত ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে মহানবী (সা.) ও ধর্মীয় গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করার সময় ছাত্রীদের নামাজ পড়ার তাগিদ দিয়েছিলেন তিনি। এই পর্যায়ে কথা বলার সময় ‘না’ শব্দটি বাদ পড়ে যাওয়ায় ‘নামাজ না পড়লে ১০ নম্বর কেটে নেওয়া হবে’—এমন একটি বাক্য উচ্চারিত হয়, যা নিয়ে বিতর্কের সূচনা হয়।

প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায় অভিযোগ করেছেন, তার বিরোধীরা পুরো বক্তব্যের মূল ভিডিওটি উপস্থাপন না করে ইচ্ছাকৃতভাবে মাত্র ৬ সেকেন্ডের একটি খণ্ডিত অংশ কাটছাঁট করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে। তিনি দাবি করেন, অনুষ্ঠানটি সফল করতে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পনা করেছিলেন এবং আয়োজনে প্রায় ৪৬ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয় হয়েছে। এই ব্যয়ের অর্থের উৎস হিসেবে বিদ্যালয়ের সভাপতির সহযোগিতা, শিক্ষকদের অবদান এবং পুরোনো খাতা ও নোট বিক্রি থেকে প্রাপ্ত ১০ হাজার ৫০০ টাকার কথা উল্লেখ করেন তিনি। কিন্তু এত দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই বক্তব্যের মাত্র ৬ সেকেন্ড ভাইরাল করা হয়েছে। সাংবাদিকতা আমাদের সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু কিছু সাংবাদিক কী কারণে এমন একটি বক্তব্য প্রচার করেছেন, তা আমার বোধগম্য নয়।

নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিম জানান, প্রধান শিক্ষক হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও নিয়মিত মুসলিম ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনে আগ্রহ দেখান। শিক্ষার্থীদের নামাজের সুবিধার্থে তিনি কক্ষের ব্যবস্থা করেছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে প্রায় ২২ হাজার টাকা ব্যয়ে জায়নামাজ কিনে দিয়েছেন। বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাবাসসুম ও আয়েশা তাহাসিন পুথি জানায়, স্যার কখনোই কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে চাননি। তারা পুরো বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছে এবং স্যারের নামাজের প্রতি উৎসাহ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তার এই উদ্যোগকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা স্বাগত জানালেও, বক্তব্য বিকৃত করে একাংশ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ায় এলাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আসল ভিডিয়োতে নামাজ, ধর্ম ও মহানবীকে নিয়ে তিনি আবেগী বক্তব্য দেন। সম্প্রতি নামাজের জন্য একটি কক্ষের ব্যবস্থা করেছেন এবং প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকার জায়নামাজ কিনে দিয়েছেন বলে আমি জানি।

ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রোকনুজ জামান বলেন, মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। তিনি পুরো ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে প্রধান শিক্ষকের বক্তব্যকে অসাবধানতাবশত ঘটে যাওয়া ভুল হিসেবেই দেখছেন। তিনি সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য যাচাই করে তথ্য তুলে ধরা জরুরি। প্রধান শিক্ষক ইতিমধ্যে তার অসাবধানতাবশত ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং সবার কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন।

রোববার ঘটনার প্রতিবাদে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একটি মিছিল বের করে এবং সঠিক তথ্য প্রচারের দাবি জানায়। উল্লেখ্য যে, এই ঘটনার পাশাপাশি এলাকায় অন্যান্য স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যু যেমন নির্বাচন, ফ্লাইট বিপর্যয় এবং অন্যান্য দাপ্তরিক কার্যক্রমের খবরও আলোচিত হচ্ছে। আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এবং ২১ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত থাকা ইউএস-বাংলার ঢাকা-রিয়াদ ফ্লাইট বাতিলের বিষয়টিও এখন স্থানীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। এদিকে, রোববার (১১ অক্টোবর) এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে।

প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায় তার পূর্ণাঙ্গ ভিডিওটি প্রকাশ করে প্রকৃত সত্য জানার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, যারা না বুঝে তার সমালোচনা করছেন, তারা পুরো প্রেক্ষাপট বিবেচনা করবেন। অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বারবার বলেছেন, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় অনুশাসন ও শিক্ষার প্রতি উৎসাহিত করা। কোনো ধরনের ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো তার কখনোই উদ্দেশ্য ছিল না বলে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন।

শেয়ার করুন