জন্মদিন এলেই হানিফ সংকেতের মন ভালো হয় না। বরং মনে পড়ে, জীবন থেকে আরও একটি বছর চলে গেল, অথচ কত কাজ এখনো বাকি। জন্মদিন নিয়ে এমনই ভাবনা তাঁর। আজ শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, দেশের জনপ্রিয় এই উপস্থাপক, নির্মাতা ও লেখকের ৬৮তম জন্মদিন। ১৯৫৮ সালের এই দিনে বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তবে জন্মদিন নিয়ে তাঁর ভাবনা অন্য রকম। কয়েক বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার কাছে সব দিনই সমান, বরং দিনটি এলে আমার একটু খারাপই লাগে। মনে হয়, জীবন থেকে একটি বছর চলে গেল।’ জন্মদিনে বড় আয়োজনের চেয়ে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতেই স্বাচ্ছন্দ্য তাঁর। স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের শুভেচ্ছা, দর্শকের ভালোবাসা আর দোয়া—এসবই তাঁর কাছে বড় পাওয়া। জন্মদিন তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ফেলে আসা সময়ের কাছেও। এক সাক্ষাৎকারে জনপ্রিয়তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হানিফ সংকেত বলেছিলেন, ‘এটার শক্তি হচ্ছে, অনুষ্ঠানের প্রতি আমার ভালোবাসা। আমার দায়বদ্ধতা, একাগ্রতা ও আন্তরিকতা; সঙ্গে একটুখানি মেধা হয়তো আছে। এরপর নিজে স্থানটি ঘুরে দেখে আয়োজনের পরিকল্পনা করেন। গান, নৃত্য, নাট্যাংশ কিংবা প্রতিবেদন—অনুষ্ঠানের প্রতিটি আয়োজনেই থাকে তাঁর পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধান। ‘ইত্যাদি’র বাইরেও নাটক নির্মাণ ও অভিনয়ে তাঁর পরিচিতি রয়েছে।
টিভি থেকে ডিজিটাল যুগ: পরিবর্তনের স্রোতে অটুট জনপ্রিয়তা
বিনোদনের মাধ্যম প্রতিনিয়ত বদলেছে। টেলিভিশনের পাশাপাশি দর্শকের হাতে এখন ইউটিউব, ফেসবুকসহ নানা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওতে মনোযোগ ধরে রাখার প্রতিযোগিতার এই সময়ে প্রায় চার দশক ধরে নিজস্ব মহিমায় টিকে আছেন হানিফ সংকেত। তাঁর কাছে ‘ইত্যাদি’ শুধু একটি বিনোদন অনুষ্ঠান নয়, পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে বসানোর উপলক্ষও। এ কারণেই অনুষ্ঠানটিকে তিনি পারিবারিক মিলনমেলা হিসেবে দেখেন। দীর্ঘদিনের এই সম্পর্কের ভিত্তি কেবল বিনোদন নয়, বরং পারস্পরিক বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ। হানিফ সংকেত নানা সময়ে স্মরণ করেছেন বইপ্রেমী পলান সরকার, তালগাছ রোপণকারী গহের আলী এবং ‘ভালো কাজের হোটেল’-এর উদ্যোক্তাদের কথা। শিক্ষা, তথ্য ও বিনোদনের সমন্বয়ই তাঁর নির্মাণভাবনার অন্যতম ভিত্তি।
ফজলে লোহানী: বন্ধু ও অভিভাবক
হানিফ সংকেতের টেলিভিশন–জীবনের শুরু ফজলে লোহানীর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে। এই বরেণ্য সাংবাদিক ও উপস্থাপকের সান্নিধ্য তাঁর পেশাগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের টিভি সাংবাদিকতার জনক ও টেলিভিশনের প্রথম সুপারস্টার। একসঙ্গে দীর্ঘদিনের পথচলায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন হানিফ সংকেতের শিক্ষক। এই ‘বন্ধু ও অভিভাবক’ পরিচয়ের মধ্যেই ধরা পড়ে তাঁদের সম্পর্কের গভীরতা। ফজলে লোহানীর সঙ্গে আড্ডা, আলোচনা, গল্প আর কাজের অভিজ্ঞতা হানিফ সংকেতকে তৈরি করেছে পরবর্তী পথচলার জন্য। সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের পর্যবেক্ষণ, রসবোধ ও সৃজনশীলতা মিলিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন স্বতন্ত্র উপস্থাপনার ধরন। অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, লেখালেখি, উপস্থাপনা ও দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের নানা দিক শিখেছেন তাঁর কাছ থেকে। ১৯৮৫ সালে ফজলে লোহানীর মৃত্যুর পর ‘ঝলক’ নামের একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দিয়ে একক উপস্থাপনা শুরু করেন হানিফ সংকেত। এর পরের গল্পটি বাংলাদেশের টেলিভিশন বিনোদনের ইতিহাসেরই অংশ। একটি পর্ব শেষ হওয়ার পরই শুরু হয় পরবর্তী পর্বের প্রস্তুতি। তবে সেই বার্তা যেন বক্তৃতা হয়ে না ওঠে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকেন তিনি।
‘ইত্যাদি’র চার দশক ও শিকড়ের সন্ধানে
১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানটি হাস্যরস, ব্যঙ্গ, গান, অভিনয়, তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন ও সামাজিক সচেতনতার সমন্বয়ে তৈরি করেছে নিজস্ব ধারা। ‘ইত্যাদি’র বিশেষত্ব শুধু বিষয়বৈচিত্র্যে নয়, উপস্থাপনার ধরনেও। আর ১৯৮৯ সালের মার্চে বাংলাদেশ টেলিভিশনে যাত্রা শুরু করে ‘ইত্যাদি’। এখানে হাসি আছে, কিন্তু অশ্লীলতার আশ্রয় নেই; ব্যঙ্গ আছে, কিন্তু বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা নেই।
হানিফ সংকেতের স্পষ্ট উচ্চারণ, ছন্দময় কথা বলা, পরিমিত রসবোধ তাঁকে দিয়েছে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা। প্রাথমিক অনুসন্ধানের জন্য প্রতিনিধি পাঠান।
নব্বইয়ের দশক থেকে স্টুডিওর চার দেয়াল ছেড়ে দেশের নানা প্রান্তে ‘ইত্যাদি’র শুটিং শুরু হয়।
হানিফ সংকেত জানিয়েছেন, কোনো জেলায় অনুষ্ঠান করার আগে সেখানকার ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে বই পড়েন, তথ্য সংগ্রহ করেন। প্রতিটি আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ইতিহাস, লোকসংগীত, সংস্কৃতি, দর্শনীয় স্থান ও মানুষের জীবনসংগ্রাম।
মিরপুরের ফাগুন অডিও ভিশনের কার্যালয়েও রয়েছে সেই প্রস্তুতির ছাপ।
ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বইয়ে সাজানো কক্ষ, শিল্পীদের পোশাক সংরক্ষণের আলাদা ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের নথিপত্র প্রমাণ করে তাঁর গবেষণাধর্মী কাজের আগ্রহ।
নিজের পড়াশোনার অভ্যাস সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘নিজেকে সমৃদ্ধ করার জন্য পড়তে হয়। শব্দভান্ডার বাড়ানোর জন্যও পড়া জরুরি।’
অসংগতির বিপরীতে আলোকিত মানুষ
সমাজের অনিয়ম ও দুর্নীতিকে ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরা ‘ইত্যাদি’র দীর্ঘদিনের বৈশিষ্ট্য। প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকা নিভৃতচারী আলোকিত মানুষদেরও তিনি তুলে আনেন পর্দায়। কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের একটি ভাসমান স্কুলের কথাও বলেছেন তিনি, যেখানে শিশুরা নৌকায় চড়ে পড়াশোনা করে। তাঁর বিশ্বাস, বিনোদনের মাধ্যমেও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। ডিজিটাল যুগে ভাইরাল হওয়ার দৌড়ে না ছুটে তিনি বরাবরই কাজের গুণগত মানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, সাময়িক শোরগোল তৈরি করা সহজ, কিন্তু মানুষের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিতে হলে কাজের নিষ্ঠা ও সততা থাকতে হয়। কখনো একটি বাক্য, কখনো শব্দের খেলা, কখনো ছোট্ট ব্যঙ্গের মধ্য দিয়ে তিনি তুলে ধরেন সমাজের বড় কোনো অসংগতি। কখনো নদীর তীরে, কখনো ঐতিহাসিক স্থাপনার সামনে, কখনো প্রাচীন কোনো জনপদে নির্মিত হয় ‘ইত্যাদি’র মঞ্চ। এর বিপরীতে সামনে এনেছেন এমন সব মানুষকে, যাঁরা নিভৃতে সমাজের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। কেউ শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন, কেউ পরিবেশ রক্ষা করছেন, কেউ বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। সেখানে শিশুদের যাতায়াত ও পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত করতে ‘ইত্যাদি’র পক্ষ থেকে সহায়তা করা হয়েছিল।
স্বীকৃতি ও কর্মজীবন
একাধারে উপস্থাপক, পরিচালক, লেখক, প্রযোজক ও গীতিকার হিসেবে তিনি বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে পেয়েছেন নানা স্বীকৃতি। ২০১০ সালে পান একুশে পদক। এছাড়া চলতি বছর তাঁর অর্জনের তালিকায় যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬। চার দশকের বেশি সময় ধরে যাঁদের হাসিয়েছেন, ভাবিয়েছেন, দেশের নানা প্রান্তের মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, সেই দর্শকদের ভালোবাসাই তাঁর পথচলার প্রধান অনুপ্রেরণা। ৬৮তম জন্মদিনে এসেও তিনি মনে করেন, এখনো অনেক কাজ বাকি। তাঁর নিষ্ঠা, সততা ও আন্তরিকতাই তাকে সময়ের সেরা নির্মাতা হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে। ১৯৮৭ সালে এই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে দর্শকের সামনে আসেন তিনি।
সূত্র: প্রথম আলো








