চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে জন্ম নেওয়া মাসুমা জাহান রিমার জীবনের পথপ্রবাহ এক বৈচিত্র্যময় গন্তব্যে এসে পৌঁছেছে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বসবাসরত একজন ডেন্টাল হাইজিনিস্ট, লেখক, শিল্পী এবং উদ্যোক্তা। নিজের বহুমুখী পরিচয় সম্পর্কে তিনি বলেন, পেশাগতভাবে ডেন্টাল হাইজিনিস্ট হলেও মনের দিক থেকে তিনি একজন লেখক, আবেগের জায়গা থেকে শিল্পী এবং নিজের ইচ্ছায় একজন উদ্যোক্তা। তাঁর মতে, সবগুলোই তিনি, আবার কোনোটাই এককভাবে শুধু তিনি নন; এই জীবনদর্শনই তাঁকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পরিচয়ে সামনে নিয়ে আসে। একটি পরিচয় শেষ হওয়ার আগেই যেন আরেকটি পরিচয় এসে কড়া নেড়েছে দরজায়। নিজের পরিচয় সম্পর্কে বলতে গিয়ে জাহান রিমার উত্তরও তাই বেশ গভীর, ‘আমার জীবনটা মিশ্র। এই একটি বাক্যেই যেন ধরা পড়ে তাঁর পুরো জীবনদর্শন। তিনি কখনোই একটি পরিচয়কে অন্যটির প্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলেননি; বরং জীবনের একেক বাঁকে একেকটি রূপকে সামনে এনেছেন।
করোনা মহামারি চলাকালীন ২০২০ সালে রিমা সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে দুর্গম এলাকায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন। এই সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক সংস্থা ‘রিমোট এরিয়া মেডিক্যাল’ (র্যাম) তাঁকে প্রশংসাপত্রে ভূষিত করে। সে সময় তিনি যখন প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি সফল?’, তখন হাসিমুখে উত্তর দেন যে, সাফল্য মানেই মনের আনন্দ এবং যেখানে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে আছে সেখানেই সে সফল। যদিও এই পথে চলার শুরুতে তিনি চরম অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই পথের এক প্রান্তে চিকিৎসাসেবা, অন্য প্রান্তে সাহিত্য।
শিল্প ও সৃজনশীলতায় রিমার হাতেখড়ি আরও আগে। ২০১৯ সালে তাঁর প্রথম গল্পের বই ‘যে তুমি মানুষ খোঁজো’ প্রকাশিত হয়। এরপর ২০২১ সালে যমজ বোন জাহান রিপার সঙ্গে যৌথভাবে তিনি প্রকাশ করেন কবিতার বই ‘রিপাবনে বিভোরিমা’। তাঁর সাহিত্যিক যাত্রার সূচনা অবশ্য ২০১৪ সালে, যখন তাঁর লেখা কবিতার ওপর নির্মিত আবৃত্তি ও সংগীতের ভিডিওতে দেশের একজন সুপরিচিত শিল্পী কণ্ঠ দিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি ‘আনন্দবাড়ির আব্বু’ শিরোনামে নতুন একটি বইয়ের কাজ করছেন। মাঝখানে শিল্প, সম্পাদনা, সৃজনশীলতা আর এখন ব্যবসা। জাহান রিমাকে কোন পরিচয়টি সবচেয়ে বেশি প্রকাশ করে।
সম্পাদনার ক্ষেত্রেও রয়েছে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। অরল্যান্ডোভিত্তিক বাংলা সাময়িকী ‘একতারা’র সম্পাদকীয় ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তিনি পালন করছেন এক দশকেরও বেশি সময় ধরে। পাশাপাশি ‘বাংলাটাইমস ৩৬০’–এর সহযোগী সম্পাদক হিসেবেও তিনি যুক্ত রয়েছেন।
উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রায় পাঁচ বছর আগে ‘দ্য ফ্লোরিডা মল’-এ ‘জাহান’স আর্টিস্টিক ওয়ার্ল্ড’ নামের একটি কিয়স্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
সেখানে তিনি মেহেদি আর্ট, বডি আর্ট, পোর্ট্রেট ও পেইন্টিংয়ের মতো সেবার আয়োজন করেন। শুরুতে মলের চড়া ভাড়া ও ব্যবসার অনিশ্চয়তা তাঁকে ভাবালেও, লেখক জ্যাক উলড্রিচের একটি উদ্ধৃতি তাঁকে সাহস জোগায়। পরবর্তীতে তিনি ইউনিভার্সাল স্টুডিওর চাকরি ও ডিজনি ওয়ার্ল্ডের মরক্কো প্যাভিলিয়নের প্রস্তাব ছেড়ে নিজের ব্যবসাকেই অগ্রাধিকার দেন। বর্তমানে ‘দ্য ফ্লোরিডা মল’ ছাড়াও ‘অরল্যান্ডো ভাইনল্যান্ড প্রিমিয়াম আউটলেটস’-এ তাঁর ব্যবসার শাখা রয়েছে। এছাড়াও অরল্যান্ডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (এমসিও) তাঁর একটি লন্ড্রোম্যাট ব্যবসাও পরিচালিত হচ্ছে।
নিজের সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশি ঐতিহ্যবাহী মেহেদি শিল্পকে আমেরিকার সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াটা রিমার জন্য বড় আনন্দের। মেহেদির পাশাপাশি তিনি তেলরং, জলরং, ওয়ান-লাইন আর্ট ও মিক্সড মিডিয়া নিয়ে নিয়মিত কাজ করেন। বর্তমানে তিনি ক্যারিকেচার শিল্প আয়ত্ত করতে একজন গুরুর কাছে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। জীবনের কঠিন সময়ে তাঁর পরিবারের সদস্যরা ‘পাওয়ারহাউস’ হিসেবে পাশে থেকেছেন এবং তাঁদের ঘরটিকে তিনি ভালোবেসে ‘আনন্দবাড়ি’ বলে ডাকেন।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করার পর যুক্তরাষ্ট্রে এসে স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও ডেন্টাল হাইজিনে পুনরায় পড়াশোনা করে তিনি নিজের জীবনের গতিপথ বদলে ফেলেন। সেই পরিবর্তনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, পুরো পৃথিবীটাকেই এখন তাঁর স্টুডিও বলে মনে হয়। নিজের এই দীর্ঘ পথচলার সাফল্যের পেছনে তাঁর অদম্য সাহস ও নিজেকে বারবার নতুন করে গড়ে তোলার তাড়না প্রতিনিয়ত কাজ করছে। সম্প্রতি অরল্যান্ডো ভয়েজার ম্যাগাজিনের ‘হিডেন জেম’ সিরিজে তাঁর এই জীবনসংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প উঠে এসেছে। সন্দ্বীপ থেকে ফ্লোরিডা পর্যন্ত তাঁর এই যাত্রা কেবল ভৌগোলিক নয়, বরং সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় তৈরির এক অনন্য আখ্যান। যুক্তরাষ্ট্রে বড় শপিং মলে এখন তিনি নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী।
সূত্র: প্রথম আলো








