নাটোর জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ নতুন রূপ নিয়েছে।
নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অশ্লীল ভিডিও এবং গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম নিহতের ঘটনায় সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে জেলা কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের মধ্যে মতদ্বৈধতা তৈরি হয়েছে। গত ৩০ অক্টোবর জেলা বিএনপির বিশেষ সভায় এ বিষয়ে কেন্দ্রকে লিখিতভাবে অবহিত করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও কোনো রিপোর্ট পাঠানো হয়নি। তাঁদের এই মনোভাব কমিটির অনেককেই হতাশ করেছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তাঁর যে বিষয়গুলো আমরা দেখেছি, তা লিখিতভাবে এবং মৌখিকভাবে কেন্দ্রকে অবহিত করব।’।
আজ মঙ্গলবার বিকেলে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান অভিযোগ করেন, কমিটির আহ্বায়ক রহিম নেওয়াজসহ একটি অংশ এই বিষয়ে কেন্দ্রকে অন্ধকারে রাখতে চাইছে। গত ১ নভেম্বর আহ্বায়ক সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি আগের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোনো প্রতিবেদন কেন্দ্রে পাঠাবেন না। আসাদুজ্জামানের মতে, আহ্বায়কের এই অনড় অবস্থানের কারণে শাকিল হত্যা ও এমপির বিতর্কিত ভিডিও সংক্রান্ত সাংগঠনিক রিপোর্ট পাঠানো সম্ভব হয়নি, যা দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা তৈরি করেছে।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার জেলা পরিষদ কার্যালয়ে আহ্বায়ক রহিম নেওয়াজের সভাপতিত্বে ওই বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রায় আট ঘণ্টা স্থায়ী ওই সভায় ১৮ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। আসাদুজ্জামান জানান, সভায় স্পষ্টভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে অপরাধী যেই হোক এবং সে যার সন্তানই হোক, তার অপরাধ বিবেচনায় বিচার নিশ্চিত করতে হবে। গঠনতন্ত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জেলা কমিটি সরাসরি কোনো যুগ্ম আহ্বায়ককে বহিষ্কার করতে পারে না, তাই বিষয়টি কেন্দ্রকে জানানোই ছিল একমাত্র সাংগঠনিক পথ। দুপুরের খাওয়াদাওয়াসহ আট ঘণ্টা ধরে এই সভা চলে।
এদিকে, সদস্যসচিবের অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রহিম নেওয়াজ দাবি করেন, সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে তাকে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। তিনি জানান, কমিটিতে ৩৪ জন সদস্য থাকলেও মাত্র ছয়জনকে নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। রহিম নেওয়াজের ভাষ্যমতে, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ছাড়া কোনো যুগ্ম আহ্বায়কের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন বা সাংগঠনিক রিপোর্ট দেওয়া সম্ভব নয়, তাই তিনি ওই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। অথচ কমিটিতে ৩৪ জন সদস্য রয়েছেন।
অন্যদিকে আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত যোগাযোগে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে কেন্দ্র বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে যারা ভিডিওর সত্যতা যাচাই করছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তি শাস্তির আওতায় আসবেন বলেই তিনি আশাবাদী। সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জিল্লুর রহমান এবং সদস্য আবু হেনা মোস্তফা কামালসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।
শাকিল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে সাতজনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে দেশের সব বিমানবন্দর ও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডে অন্তত ১০ জন সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের বড় ছেলে নূরুজ্জামান মিন্টুসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নূরুজ্জামানকে দুই দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, পুলিশের নজরদারি এড়িয়ে সন্দেহভাজন সাতজন অবৈধ পথে বিদেশে পালানোর চেষ্টা করছেন। তাদের পাসপোর্ট-সংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল গুরুদাসপুরের নয়াবাজার এলাকায় এক আসামির শ্বশুরবাড়ির আঙিনা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তদন্তে বড় অগ্রগতি আসবে বলে গোয়েন্দারা আশা করছেন।
গত ১৪ অক্টোবর রাতে গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড় এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত হন শাকিল। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৬ অক্টোবর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার ১৯ অক্টোবর নিহতের বাবা রবিউল করিম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ৮-১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরবর্তীতে শাকিলের মৃত্যুতে এটি হত্যা মামলায় রূপান্তর হলে গ্রেপ্তার অভিযানের গতি বৃদ্ধি পায়। এ মামলায় তাঁকে দুইবার রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে।
সূত্র: প্রথম আলো








