বরিশাল আদালত প্রাঙ্গণে বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে বোমাসদৃশ একটি বস্তুর বিস্ফোরণ ঘটেছে। মহানগর দায়রা জজ আদালতের ১০ তলা ভবনের প্রধান ফটকের অদূরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিকট শব্দে এই বিস্ফোরণটি হয়। ঘটনার পর আদালত এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি) কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে কাচের গুঁড়া, বারুদের অবশিষ্টাংশ ও প্লাস্টিকের আলামত সংগ্রহ করেছে।
বিস্ফোরণের কারণ নিয়ে পুলিশ প্রাথমিকভাবে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিএমপি কমিশনার জানান, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এর একটি উদ্দেশ্য হতে পারে। এছাড়া আগস্ট মাসকে কেন্দ্র করে কোনো গোষ্ঠী তাদের উপস্থিতির জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সফরের পর ডাচ রাষ্ট্রদূতের বরিশালে আসার কর্মসূচিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণের কোনো পরিকল্পনা ছিল কিনা, তা-ও তদন্তের আওতায় রয়েছে। তবে সেমিনারটি শেষ পর্যন্ত বাতিল করা হয়। এছাড়া বাকেরগঞ্জের দুধলমৌ গ্রামে ৩ আগস্টের বিস্ফোরণের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আছে কিনা, তা যাচাই করা হচ্ছে।
মহানগর পুলিশের বিশেষ শাখার এক কর্মকর্তা জানান, ঘটনাস্থলে জর্দার কৌটার মুখ পাওয়া গেছে, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে এটি বড়জোর পটকা জাতীয় কিছু হতে পারে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে এবং বস্তুটি ওপর থেকে ছোড়া হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে। আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট নাজিমউদ্দিন আহম্মেদ পান্না ও আইনজীবী তসলিমউদ্দিন আহম্মেদ এই ঘটনাকে নাশকতার অংশ হিসেবে দেখছেন এবং এর সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, বরিশালের ঘটনার আগের দিন মঙ্গলবার মধ্যরাতে ঢাকার সাভারেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাভারের সাদাপুর গোপের বাড়ি লালটেক ঘোড়া মসজিদের মাঠে একটি নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রামের ভেতর প্রেশারকুকার বোমা, কাপড়চোপড় ও কুরআন শরিফ পাওয়া যায়। স্থানীয়রা ড্রামটি দেখে ৯৯৯-এ কল করলে পুলিশ এলাকা ঘিরে ফেলে। বুধবার বিকাল ৬টা ১০ মিনিটে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট বিস্ফোরণের মাধ্যমে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে। স্থানীয়দের দাবি, রাতে অজ্ঞাত তিন ব্যক্তি ড্রামটি সেখানে রেখে গিয়েছিল।
এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সাভারের হেমায়েতপুরের শ্যামপুরে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) একটি আস্তানায় অভিযান চালায় সিটিটিসি। অভিযানে আরিফ নামে এক সক্রিয় সদস্যকে আটক করা হয়। ১ আগস্ট ড্রাইভিং ও শিক্ষকতার ভুয়া পরিচয় দিয়ে সে বাড়িটি ভাড়া নিয়েছিল। তার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ লিফলেট উদ্ধার করা হয়।
সিটিটিসি ইউনিটের যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন জানান, আরিফের ব্যাগে ছয়টি শক্তিশালী পাইপ বোমা ছিল। পরে বাড়িটিতে তল্লাশি চালিয়ে আরও ৯টি পাইপ বোমা, গানপাউডার, সায়ানাইডসহ বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। মোট ১৫টি পাইপ বোমা বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট সফলভাবে নিষ্ক্রিয় করে। বাড়ির মালিকের মেয়ে ইলমা রহমান জানান, ভাড়াটিয়া দম্পতি বাচ্চাদের পড়ানোর কথা বলে বাসাটি নিয়েছিল, কিন্তু ভেতরে যে এমন ভয়ংকর পরিকল্পনা চলছিল তা তারা বুঝতে পারেননি।
এর আগে ৩১ জুলাই আশুলিয়ার একটি মুদি দোকানে ফেলে যাওয়া প্রেশারকুকার বোমা এবং মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে শক্তিশালী ছাতাবোমা উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে নেমে পুলিশ নাজমুল হাসান ওরফে ‘বোমারু মামুন’ নামে একজনকে শনাক্ত করে। আরিফ আটক হলেও মামুন এখনো পলাতক। পুলিশ জানায়, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া অনেক জঙ্গি সদস্য পুনরায় ছোট ছোট সেল গঠন করে নাশকতার পরিকল্পনা করছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, মামুন ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টর থেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং নব্য জেএমবির শুরা সদস্য ছিলেন। এর আগে ১৫ আগস্ট পান্থপথের হোটেলে ‘অপারেশন আগস্ট বাইট’ অভিযানে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে সাইফুল ইসলাম নামে এক হামলাকারী নিহত হন। ২০১৯ সালের ১১ আগস্ট ওই মামলার অভিযোগপত্রেও মামুনের নাম ছিল।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মামুন জঙ্গি সংগঠনের জন্য অর্থ সংগ্রহ, বিস্ফোরক তৈরি ও প্রশিক্ষণের দায়িত্ব পালন করতেন। ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে বের হয়ে তিনি কেরানীগঞ্জ ও সাভারে অবস্থান নেন এবং শেখ আল আমিন ও মোহাম্মদ আরিফসহ অন্তত ১৫ জনকে নিয়ে নতুন করে তৎপরতা শুরু করেন। বর্তমানে পুলিশ ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) যৌথভাবে এই নেটওয়ার্ক ও বোমার উৎস নিয়ে ছায়া তদন্ত চালাচ্ছে।
পরপর কয়েকটি স্থানে বোমা উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। পুলিশ জানিয়েছে, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়। সিসিটিভি ফুটেজ ও সংগৃহীত আলামত পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করার কাজ চলমান রয়েছে।
সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম জানান, সাভারের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা বা নাশকতার নেপথ্যের ব্যক্তিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ৯ ও ১০ জুলাই মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বরিশাল ও ঝালকাঠি সফর করেন।
এর আগে ৩ আগস্ট বাকেরগঞ্জের দুধলমৌ গ্রামে রহস্যজনক বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ তিনজন আহত হন।
পরে ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেন তারা।
বরিশাল ব্যুরো ও প্রতিবেদন, ঢাকা উত্তর ও সাভার
এ সময় বিস্ফোরণের শব্দে আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে।
নিরাপদ দূরত্বে থেকে শত শত উৎসুক মানুষ ঘটনাটি দেখেন।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিস্ফোরণের ধরন ও ব্যবহৃত বিস্ফোরক সম্পর্কে জানা যাবে।’
এছাড়া অন্য কারণও তদন্তে রাখা হয়েছে।
বুধবার বরিশালের একটি হোটেলে নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত বোরিস ভ্যান বোমেলের সেমিনারে যোগ দেওয়ার কথা ছিল।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী এলাকার আরিফ ১ আগস্ট ড্রাইভিং ও শিক্ষকতার ভুয়া পরিচয় দিয়ে পরিবার নিয়ে থাকার কথা বলে বাড়িটির নিচতলার একটি কক্ষ ভাড়া নেন।
শ্যামপুরে প্রায় ৪ ঘণ্টা ঘিরে রাখার পর মঙ্গলবার রাত ১০টায় আব্দুল জলিলের বাড়িতে অভিযান চালায় সিটিটিসি।
ভাড়া নেওয়ার সময় বলা হয়েছিল, স্বামী-স্ত্রী থাকবেন এবং পাশের একটি স্কুলে বাচ্চাদের পড়াবেন।
মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার ও দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে থাকা অনেক আলোচিত জঙ্গি সদস্য ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুক্তি পান।
২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে শক্তিশালী ছাতাবোমা উদ্ধারের ঘটনায় তদন্ত করতে গিয়ে মামুনকে শনাক্ত করে পুলিশ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে বের হয়ে তিনি কেরানীগঞ্জ ও সাভারে বসবাস শুরু করেন।
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সূত্র: যুগান্তর








