রাশিয়ার বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে ইউক্রেনের সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান অবলম্বন স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থা স্টারলিংক। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের আরেকটি সেবা ‘স্টারশিল্ড’-এর ব্যবহার ও এর গতিসীমা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের বিভিন্ন সামরিক অভিযানে এই সেবা ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগ উঠেছে, যা দেশটির রণক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ইউক্রেনের সেনারা জানায়, রাতভর স্টারশিল্ডের সামরিক পর্যায়ের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবায় প্রবেশাধিকার কমে যাওয়ায় তাদের যুদ্ধক্ষেত্রের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। তবে জেলেনস্কি দ্রুতই মস্কোর বিরুদ্ধে সেই সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন। স্টারলিংক বেসামরিক বা প্রতিরক্ষামূলক কাজে ব্যবহারের জন্য সীমাবদ্ধ; আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে এর ব্যবহার একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুচিত। তবে স্টারশিল্ডে ঠিক কতটি স্যাটেলাইট ব্যবহৃত হয়, তা জানা যায়নি। দুটি ব্যবস্থাই সম্পর্কিত স্যাটেলাইট প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হলেও তাদের সেবার ধরন এবং ব্যবহারের উদ্দেশ্য আলাদা।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সামরিক প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সেরহি বেসক্রেস্তনভ জানিয়েছেন, স্টারশিল্ডের সামরিক প্যাকেজে গতি সীমিত করে দেওয়ায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, ঘণ্টায় ১০০ মাইলের বেশি গতিতে চলা ডিভাইসগুলোর ওপর এই বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো ধরনের আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই হঠাৎ সেবা সংকুচিত করে ফেলায় ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনী চরম অসুবিধায় পড়েছে। রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল আমদানির বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনার সমালোচনা করেছিলেন জেলেনস্কি। গত সপ্তাহে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সমঝোতার পর ট্রাম্প রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের একটি ‘এনার্জি যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করেন। এর পর ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে আবারও হামলা শুরু করে। ওয়াশিংটনের চাপের মধ্যেই এসব হামলা চালানো হয়। যুক্তরাজ্য থেকে বুধবার কথা বলার সময় স্টারলিংকের সেবা ও গোয়েন্দা তথ্যপ্রাপ্তিতে ‘সমস্যা’ দেখা দেওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন জেলেনস্কি।
জেলেনস্কি সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, এটি কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয় বরং একটি ইচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত। যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড সেবায় এমন পরিবর্তন তাকে বিস্মিত করেছে। তার সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এই প্রযুক্তি ঠিকমতো কাজ না করলে সম্মুখ সমরে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটতে পারে। রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতার পর জ্বালানি অবকাঠামো নিয়ে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক উত্তেজনার রেশ ধরেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তার ধারণা। বেসক্রেস্তনভের ধারণা, তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এ বিধিনিষেধের সম্পর্ক থাকতে পারে। ‘পিয়ার্স মরগান আনসেন্সরড’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি ইঙ্গিত দেন, তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে স্টারলিংকের গতি কমানো হয়ে থাকতে পারে। তবে দুই ব্যবস্থার প্রযুক্তি ও কার্যক্রমের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় তাদের পার্থক্য সব সময় স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা সহজ নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক অবশ্য এসব অভিযোগের দায়ভার নিতে নারাজ।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্টারশিল্ডের ব্যবহার সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে।
তার দাবি, স্টারলিংক একটি বাণিজ্যিক সেবা হলেও স্টারশিল্ড সরাসরি মার্কিন সামরিক বাহিনীর নির্দেশনায় পরিচালিত হয়।
এই বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো স্পষ্ট মন্তব্য পাওয়া যায়নি, যদিও হোয়াইট হাউসের সংশ্লিষ্ট মহলের সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো অনুরোধ করা হয়নি।
লন্ডনের কিংস কলেজের প্রতিরক্ষা অধ্যয়ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মার্ক হিলবোর্ন জানান, স্টারলিংক সাধারণ ইন্টারনেটের বিকল্প হিসেবে কাজ করলেও স্টারশিল্ড মূলত সামরিক প্রয়োজনের জন্য নকশা করা। স্টারলিংকের নেটওয়ার্কে ১০ হাজারের বেশি স্যাটেলাইট থাকলেও স্টারশিল্ডের সক্ষমতা এবং সংখ্যাটি জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে গোপন রাখা হয়েছে। টড হ্যারিসনসহ অন্যান্য নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, স্টারশিল্ডের প্রকল্প চুক্তির খুঁটিনাটি গোপনীয় রাখা হয়, যা মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের জাতীয় সুরক্ষার অংশ। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো টড হ্যারিসন বলেন, এসব প্রকল্পের চুক্তিসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য গোপনীয় হিসেবে রাখা হয়। তার মতে, বর্তমানে এমন সমন্বিত চিত্র পাওয়ার সক্ষমতা অন্য কারও কাছে আছে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এ কারণে দ্রুতগতিতে বিপুল পরিমাণ তথ্য আদান-প্রদান সম্ভব হয় এবং সংকেত পৌঁছাতে বিলম্ব তুলনামূলক কম হয়।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে স্টারলিংক ও স্টারশিল্ডের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। হিলবোর্নের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, স্টারশিল্ডে সাধারণ ইন্টারনেটের চেয়ে উচ্চমাত্রার এনক্রিপশন বা তথ্য সুরক্ষাব্যবস্থা এবং পৃথিবী পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ সেন্সর রয়েছে। এগুলো রাডার প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীর ছবি সংগ্রহের উপযোগী। ফলে এটি যুদ্ধের ময়দানে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য অত্যন্ত কার্যকর একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এসব সেন্সরের মাধ্যমে রাডার ব্যবহার করে পৃথিবীর ছবি সংগ্রহ করা সম্ভব, যা অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ আলোকচিত্রের তুলনায় বাড়তি সুবিধা দেয়।
ইউক্রেনের জন্য স্টারশিল্ড কেন অপরিহার্য তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে এবং রাশিয়ার ড্রোন প্রতিহত করতে যে ড্রোন ব্যবহার করে, তার দিকনির্ণয় ও পরিচালনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন স্যাটেলাইট সংযোগ প্রয়োজন। গতিসীমা বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে ড্রোনগুলো নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে এবং লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
এদিকে, ইউক্রেনের সংবাদ সংস্থা ইউক্রিনফর্ম জানিয়েছে যে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী বর্তমানে স্টারশিল্ড সেবা পুনরায় সচল হয়েছে। তবুও এই প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তনের জন্য কতটা প্রভাবশালী হতে পারে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। রিপাবলিকান দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতাও পুরো বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
পরিশেষে, স্টারশিল্ড কেবলমাত্র ইন্টারনেট সেবাই নয়, এটি আধুনিক যুদ্ধের একটি শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার। স্পেসএক্সের তথ্যমতে, পৃথিবী এবং পৃথিবীর কক্ষপথের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য। তবে এই প্রযুক্তির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ যখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তখন তা ইউক্রেনের মতো যুদ্ধরত দেশের জন্য বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে যখন টানাপোড়েন চলছে, তখনই এ ঘটনা সামনে আসে।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ








