ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে নাগরিক স্বাধীনতার সূচকে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বিশ্বে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউসের ‘ফ্রিডম অন দ্য নেট ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ১২ মাসের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ফ্রিডম হাউসের ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০০ স্কোরের মধ্যে এ বছর বাংলাদেশের পয়েন্ট ৫০। এর আগের দুই বছর বাংলাদেশের স্কোর ছিল যথাক্রমে ৪০ ও ৪৫। সূচকে বাংলাদেশের ৫ পয়েন্ট উন্নতির মধ্যে ৪ পয়েন্ট এসেছে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ বৃদ্ধির কারণে এবং ১ পয়েন্ট এসেছে অনলাইনে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর বিধিনিষেধ হ্রাসের ফলে। তবে এই উন্নতি সত্ত্বেও ‘আংশিক স্বাধীন’ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। সূচকে ৭০ থেকে ১০০ স্কোর পেলে ‘স্বাধীন’, ৪০ থেকে ৬৯ পেলে ‘আংশিক স্বাধীন’ এবং ৩৯ বা তার নিচে স্কোর পেলে ‘স্বাধীন নয়’ হিসেবে গণ্য করা হয়। বাকি ১ পয়েন্ট এসেছে অনলাইন আধেয়র (কনটেন্টে) ওপর বিধিনিষেধ কমার কারণে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোনো দেশের স্কোর ৭০ থেকে ১০০-এর মধ্যে থাকলে সেটিকে ইন্টারনেটে ‘স্বাধীন’, ৪০ থেকে ৬৯-এর মধ্যে থাকলে সেটিকে ‘আংশিক স্বাধীন’ ও ০ থেকে ৩৯-এর মধ্যে থাকলে দেশটি ‘স্বাধীন নয়’ বলে বিবেচনা করা হয়। তাঁদের মধ্যে অনলাইন সংবাদমাধ্যমে কাজ করা সাংবাদিকেরাও রয়েছেন।
ফ্রিডম হাউসের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেটে স্বাধীনতার হার ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী। তবে বাংলাদেশে ২০১৬ সালের পর এই প্রথমবারের মতো পুরো এক বছরে কোনো ইন্টারনেট ‘শাটডাউন’ বা পুরোপুরি সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও পরবর্তীতে গৃহীত সংস্কার উদ্যোগকে এই অগ্রগতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইন্টারনেট স্বাধীনতার সূচকে ৯১ পয়েন্ট নিয়ে এস্তোনিয়া শীর্ষে অবস্থান করছে। অন্যদিকে চীন, ইরান ও মিয়ানমার ৯ পয়েন্ট নিয়ে তালিকার একেবারে তলানিতে রয়েছে। রাশিয়ার স্কোর ১৬, পাকিস্তানের ২৭ এবং ভারতের ৫০। বিশ্বের প্রায় ৭১ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা নিয়ে করা এই সমীক্ষায় দেখা যায়, মাত্র ৯ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ মুক্ত ইন্টারনেটের পরিবেশে আছেন, যেখানে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যবহারকারীকে ‘মুক্ত নয়’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।
ইন্টারনেটে স্বাধীনতার উন্নতি ঘটলেও সাংবাদিকদের সুরক্ষা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বজায় রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জুলাই গণ–অভ্যুত্থান পরবর্তী সময় থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত আড়াই শতাধিক সাংবাদিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার শিকার হয়েছেন। এগুলোর বেশির ভাগই ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান নিয়ে করা সংবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যেগুলোকে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে গণ্য করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়ও ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের ২৮০ জনের বেশি সাংবাদিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগে মামলার মুখোমুখি হয়েছেন।
প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই দুটি গণমাধ্যমকে ‘ভারতপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রচার চালানোর পর কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য চরম উদ্বেগজনক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর একদল মানুষ সংবাদমাধ্যম দুটির কার্যালয়ে হামলা চালায় এবং ভবনে আগুন দেয়।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধী দলের আন্দোলন দমনে যেভাবে ইন্টারনেট শাটডাউন করা হতো, তা দেশটির স্বাধীনতার পরিসর সংকুচিত করেছিল। এখন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্জিত এই ইন্টারনেট স্বাধীনতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ও টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা। যদিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারও কখনো কখনো আওয়ামী লীগ সরকারের মতো দমনমূলক কৌশল প্রয়োগের পথে হেঁটেছে। এতে সেখানে কর্মরত সাংবাদিকেরা বিপদের মুখে পড়েন।
পরিশেষে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের বিষয়টিও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে। সব মিলিয়ে, গণ–আন্দোলনের মাধ্যমে ডিজিটাল দমন-পীড়নের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ যেভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে, তা বিশ্বজুড়ে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
সূত্র: প্রথম আলো








