মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে শক্ত ঘাঁটি বা ‘লাল দুর্গ’ দীর্ঘকাল ধরে অজেয় মনে হতো, তা এখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, কট্টর রিপাবলিকান অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতেও ট্রাম্পের দলের ভরাডুবি হয়েছে। এই বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হচ্ছে যে, যাঁদের সমর্থন নিয়ে ট্রাম্প বারবার হোয়াইট হাউসে জয়ী হয়েছিলেন, সেই ভোটব্যাংকের ওপর থেকে তাঁর নিয়ন্ত্রণ ক্রমে আলগা হয়ে যাচ্ছে। মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার হয়ে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন হাকিম জেফ্রিস।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প বারবার ভোটারদের কাছে অনুরোধ করে বলেছিলেন, ‘মনে করুন ব্যালটে আমিই আছি।’ তিনি এই একই বার্তা প্রায় ৪৭ বার পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। তবে ভোটাররা ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দিলেও তা তাঁর প্রত্যাশিত ছিল না। বুধবার সকালের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদের জাতীয় ভোটে ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ১৩ শতাংশ ব্যবধানে জয়ী হয়েছে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের হিসাবমতে, ১৯৭৬ সালের পর কোনো কংগ্রেস নির্বাচনে কোনো দলের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয়। এমনকি ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটন এবং ২০১০ সালে বারাক ওবামার সময়ে রিপাবলিকানদের যে ঐতিহাসিক জয় হয়েছিল, ডেমোক্র্যাটদের এই ব্যবধান তাকেও ছাড়িয়ে গেছে। ভোটাররা ট্রাম্পের কথা শুনেছেন—তবে তিনি যেমনটা আশা করেছিলেন, সেভাবে নয়। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের এই সুনামি এক দশকের বেশি সময় ধরে জাতীয় রাজনীতিতে রাজত্ব করা এক চরম অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্টের মুখ থুবড়ে পড়ারই চিত্র তুলে ধরেছে। আসন পুনর্নির্ধারণের কারণে অবশ্য এই বিপুল ভোটের ব্যবধান হয়তো অতীত ঐতিহাসিক বছরগুলোর মতো সমপরিমাণ আসনে রূপান্তরিত না-ও হতে পারে। মঙ্গলবার রাতে টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ব্যালটে ছিলাম না; আর আমি ছিলাম না বলেই আমরা পর্যাপ্ত ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে টানতে পারিনি।’। তবে ট্রাম্পের এই দাবিতে খোদ রিপাবলিকানদের অনেকে ভুরু কুঁচকাবেন। আর কার্যালয়ে থাকা অবস্থায় নিজের ব্যবসা ও আয়রোজগার–সংক্রান্ত নৈতিকতার প্রশ্নগুলোকে তিনি বারবার তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন, যা ভোটারদের মনে দুর্নীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ ছাড়া ভোক্তাদের খরচ বাড়িয়ে দেওয়া আমদানি শুল্কের নীতির বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানিয়েছেন তাঁরা। ভোটাররা কিসে বিরক্ত হচ্ছেন সেই সতর্কসংকেত থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের প্রিয় নির্মাণ প্রকল্পগুলোর প্রতি তাঁর মোহ বাস্তবতার এক চরম স্মারক হিসেবে দেখা দেয়—যেন ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির ঠিক আগে রিচার্ড এম নিক্সন ওয়াটারগেট কমপ্লেক্সের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর। ২০২৮ সালে এভাবেই আমরা জয়ী হতে পারব।’। একইভাবে ১৯৯৪ এবং ২০১০ সালে রিপাবলিকানদের বিশাল জয় ক্লিনটন ও ওবামা প্রেসিডেন্সির সমাপ্তির বার্তা দিয়েছিল বলে মনে করা হলেও, দুই বছর পরই তাঁরা দুজনই অনায়াসে পুনর্নির্বাচিত হন।
হোয়াইট হাউসের সাবেক রাজনৈতিক পরিচালক ডগলাস সসনিক এই ফলাফলকে ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির গত দুই বছরের কাজের প্রতি চরম প্রত্যাখ্যান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি মনে করেন, আমরা এখন এক নতুন রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধাপে প্রবেশ করেছি, যা আগামী দুই বছর চলমান থাকবে। ডগলাস সতর্ক করেন যে, আগামী দুই বছর আগের চেয়েও বেশি অস্থিরতা বয়ে আনতে পারে। পূর্বসূরিদের চেয়েও বেশি ট্রাম্প নিজের কাঁধে এই মধ্যবর্তী নির্বাচনকে গণভোটের রূপ দিয়েছিলেন, আর শেষ পর্যন্ত তারই খেসারত দিতে হলো তাঁকে। যাঁরা একসময় পরিবর্তনের আশায় রাজনীতি-বহির্ভূত এই ব্যক্তির ওপর আস্থা রেখেছিলেন, তাঁরা এবার হয় তাঁর দলকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, না হয় ভোটদান থেকেই বিরত থেকেছেন। তাঁরা সীমান্ত বন্ধের আশা করলেও বছরের পর বছর ধরে দেশে বাস করা মানুষদের ওপর যেভাবে কঠোর গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়েছে, তা তাঁরা মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু ইতিহাস বলে, এ ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন বহুবার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কিন্তু এর মাত্র ছয় বছর পর রোনাল্ড রিগ্যান দলকে আবারও হোয়াইট হাউসে ফিরিয়ে আনেন। তাই এর থেকে দেশের রাজনৈতিক চরিত্রে স্থায়ী পরিবর্তন এসেছে বলা যায় না।
নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিতে রাজি নন ট্রাম্প। নিজের বিরুদ্ধে জনগণের এই রায়কে অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, ব্যালটে তিনি নিজে ছিলেন না বলেই ভোটারদের কেন্দ্রে আনা সম্ভব হয়নি। তবে ট্রাম্পের এই দাবির সঙ্গে অনেক রিপাবলিকানই একমত হতে পারছেন না। কারণ, প্রচারণার প্রতিটি ইস্যু, কৌশল এবং মূল বক্তব্য ট্রাম্পের নির্দেশেই পরিচালিত হয়েছিল। এমনকি দলের প্রার্থীদেরও শতভাগ আনুগত্যের চাপে রাখা হয়েছিল, যার ফলে তারা ট্রাম্প থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে ব্যর্থ হন। কারণ, ‘কৃত্রিমভাবে সীমানা বিন্যাসের ফলে প্রতিপক্ষ দলের কাছ থেকে আসন ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি তেলের আকাশছোঁয়া দাম, ইরানের সঙ্গে সমাধানহীন যুদ্ধ এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের বিরুদ্ধে মুনাফাখোরির অভিযোগ ভোটারদের দারুণভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। অনেক ভোটার জরিপকারী জানিয়েছেন, ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতিতে তারা প্রতারিত বোধ করছেন। সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বা জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকা ভোটারদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। টেক্সাসের কেন প্যাক্সটন ও সাউথ ক্যারোলাইনার ডারলিন গ্রাহামের মতো ট্রাম্পের পছন্দের প্রার্থীদের পরাজয় এ ক্ষেত্রে তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব হ্রাসের স্পষ্ট প্রমাণ দেয়। অনেক ভোটারের জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত উদ্বেগ কমানোর পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়ার বদলে তিনি রিফ্লেক্টিং পুলের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর সমাপনী ভাষণ দেন, যেখানে তিনি শেওলা ও পাইপলাইন নিয়ে কথা বলেন।
নির্বাচনী এই পরাজয় নিয়ে রিপাবলিকানদের ভেতর থেকেও ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। সাবেক ডেমোক্র্যাট ও শিকাগোর মেয়র রাম ইমানুয়েল বলেন, দলের মূলধারার বাইরের রিপাবলিকানরা এখন ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করতে শুরু করেছেন। ২০২৭ সালের কৌশল নির্ধারণই হবে তাঁদের পরবর্তী লক্ষ্য। তবে ক্লাব ফর গ্রোথের সভাপতি ডেভিড ম্যাকইনটোশ মনে করেন, ট্রাম্পকে এখনই বাতিলের খাতায় ফেলা ঠিক হবে না। তিনি মনে করেন, রিপাবলিকানদের আবারও দলীয় মূল নীতিতে ফিরে আসতে হবে। রক্ষণশীল অর্থনৈতিক নীতি প্রচারকারী সংস্থা ক্লাব ফর গ্রোথের সভাপতি ডেভিড ম্যাকইনটোশ বলেন, ট্রাম্পের সমালোচকেরা আগেও তাঁর রাজনৈতিক বিদায়ের কথা বলেছেন এবং প্রতিবারই ভুল প্রমাণিত হয়েছেন। ডেভিড আরও বলেন, ‘সমাধান হলো রিপাবলিকানদের আবার আমাদের নীতিমালায় ফিরে যাওয়া।
ইতিহাসের বিশ্লেষণে অধ্যাপক লিন ভাভরেক জানান, এই নির্বাচনের মূল নিয়ামক ছিল জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। তিনি মনে করেন, ট্রাম্পের উজ্জ্বলতা আগের চেয়ে ম্লান হয়েছে এবং মানুষের মধ্যে তাঁর প্রতি অনুরাগের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফোর্ডহাম ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ক্রিস্টিনা গ্রিয়ারের মতে, রিপাবলিকান পার্টি এখন সম্পূর্ণভাবে ট্রাম্পের আদলে গড়ে উঠেছে, যেখানে অনুগতদের আধিপত্য ও স্বাধীনচেতাদের কোণঠাসা করার প্রবণতা স্পষ্ট।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের উপদেষ্টা জো গ্রোগান অবশ্য মনে করেন, ট্রাম্প এমন কিছু ইস্যু সামনে এনেছেন যা আগে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পেত না।
পরাজয়ের পরও দলের ভেতরে ট্রাম্পবাদের প্রভাব এখনই শেষ হয়ে যাবে না বলে তিনি দাবি করেন।
নির্বাচনের এই ফলাফল মার্কিন রাজনীতির নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে ডেমোক্র্যাটদের এই জয়কে একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
১৯৭৪ সালের ওয়াটারগেট-পরবর্তী ডেমোক্রেটিক জোয়ারের সঙ্গে অনেকেই এবারের পরিস্থিতির তুলনা করছেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে মার্কিন রাজনীতি পুরোপুরি ট্রাম্প-পূর্ব যুগে ফিরে যাবে; বরং সামনের দিনগুলোতে আমেরিকান রাজনীতির গতিপথ কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: প্রথম আলো








