কেন গোলকিপারদের জন্য অধরা ব্যালন ডি’অর?

প্রকাশ:

ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’অর। কিন্তু ১৯৬৩ সালে লেভ ইয়াশিনের পর আর কোনো গোলকিপার এই ট্রফি জিততে পারেননি। এবারের ব্যালন ডি’অরে মনোনীত ৩০ জনের তালিকায় কোনো গোলকিপারই নেই, যার অর্থ ২৬ অক্টোবর লন্ডনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কোনো গোলরক্ষককে এই পুরস্কার হাতে দেখা যাবে না। ফুটবল ইতিহাসের ট্র্যাজেডি হলো, যারা গোল ঠেকিয়ে দলের হার বাঁচান, ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে তারাই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত থেকে যান। মেসি, এমবাপ্পে, ইয়ামাল, কেইন—ব্যালন ডি’অরে সাবেকদের ফেবারিট কে।

গোলরক্ষকদের ব্যালন ডি’অর না পাওয়ার পেছনের কারণগুলো বেশ জটিল।

এর মধ্যে একটি বড় কারণ হলো পারফরম্যান্স মূল্যায়নের পদ্ধতি। জফ তাঁর সময়ে ধারাবাহিকতা ও রক্ষণাত্মক দক্ষতার প্রতীক।

একজন আক্রমণভাগের খেলোয়াড় গোল বা অ্যাসিস্টের মাধ্যমে সরাসরি অবদান রাখেন, যা সহজে পরিসংখ্যান দিয়ে প্রকাশ করা যায়। পক্ষান্তরে, একজন গোলকিপারের প্রভাব মূলত প্রতিরোধমূলক। একজন ভালো গোলকিপার সারা ম্যাচে দুর্দান্ত পারফর্ম করেও শেষ মুহূর্তে একটি ভুলের জন্য সব গৌরব হারাতে পারেন। এর আদর্শ উদাহরণ ২০০২ বিশ্বকাপের ফাইনাল। জার্মানির তৎকালীন গোলকিপার অলিভার কান সেবার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স দেখিয়েছিলেন, কিন্তু ফাইনালে একটি ভুলের কারণে ব্রাজিলের কাছে গোল খেয়ে সবকিছু মাটি করে ফেলেন। স্মৃতির পাতা থেকে ২০০২ বিশ্বকাপ ফাইনালটা সবার আগে উঠে আসার কথা। কিন্তু পজিশনটাই যেন ‘থ্যাংকলেস জব’—গোটা ম্যাচে বুক চিতিয়ে সব ঠেকানোর পরও সামান্য ভুলে গোল হজম করলে গেল গেল রব ওঠে। জুভেন্টাসের দুর্দান্ত তো ছিলেনই, এর পাশাপাশি ইতালির পোস্টে ১০৪২ মিনিট গোল হজম করেননি জফ। সে ম্যাচেরই হয়তো ৫০ মিনিটে গোলকিপারের অবিশ্বাস্য সেভ হয় সেই ম্যাচেরই প্রতিবেদনে বর্ণনায় বিষয়। বুফনের শট ঠেকানোর ক্ষমতা ছিল অবিশ্বাস্য। অন্যদিকে একজন গোলরক্ষকের প্রভাব মূলত প্রতিরোধমূলক, সূক্ষ্ম এবং পুরো ৯০ মিনিটে বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে। এতে হয়তো কোনো সেভ থাকে না, কোনো হাইলাইটস হয় না এবং তাৎক্ষণিকভাবে চোখে পড়ার মতো কোনো পরিসংখ্যানও থাকে না।

সেই ২০০২ সালে অলিভার কান ব্যালন ডি’অর জয়ে তৃতীয় হয়েছিলেন। যদি সেই ফাইনালে জার্মানি জয়ী হতো, তবে লেভ ইয়াশিনের পর দ্বিতীয় গোলকিপার হিসেবে কান এই পুরস্কারটি জিততে পারতেন। ২০১১ সালেও তিনি তৃতীয় হয়েছিলেন। অথচ কানই বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জেতা একমাত্র গোলকিপার। একইরকম পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন অন্য কিংবদন্তিরাও। ১৯৭৩ সালে দিনো জফ দ্বিতীয় হয়েছিলেন, আবার ২০০৬ সালে জিয়ানলুইজি বুফন এবং ২০১৪ সালে ম্যানুয়েল নয়্যারও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ব্যালন ডি’অরে দ্বিতীয় স্থান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। ২০১১ ব্যালন ডি’অর পুরস্কারেও তৃতীয় হওয়া কানের সে বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স গোলকিপারদের ব্যালন ডি’অর জয়ের দাবিকে জোরালো করে তোলে। সেই খোঁজের আগে একটি তথ্য আগেভাগে জানিয়ে রাখা যাক। প্রতিটি উদাহরণই বলে দেয়, গোলকিপারদেরও বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

গোলকিপারদের অবদানকে প্রথাগত মেট্রিকস দিয়ে মেপে দেখা কঠিন। এখনকার আধুনিক ফুটবলে প্রত্যাশিত গোল বা শট-পরবর্তী প্রত্যাশিত গোল মডেলের মাধ্যমে গোলকিপারের সেভ করার দক্ষতা বোঝার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মাঠের বাইরে পাস দেওয়া, সুইপার হিসেবে কাজ করা বা বিপদের আগাম সংকেত বুঝতে পেরে দলকে রক্ষা করার বিষয়গুলো পরিসংখ্যানের ছক দিয়ে সবসময় ফুটিয়ে তোলা যায় না। রক্ষণভাগের পেছনের জায়গা নিয়ন্ত্রণ করা বা দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেওয়া একজন গোলকিপারের ‘অদৃশ্য’ অবদান, যা ম্যাচ-পরবর্তী আলোচনায় খুব একটা গুরুত্ব পায় না। এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বোঝা যায়, ফুটবল কীভাবে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স পরিমাপ করে, উদ্‌যাপনের জন্য ঠিক কী বেছে নেওয়া হয় এবং গোলকিপারদের অবদান মূল্যায়ন করা কেন কঠিন। শুধু গোল ঠেকানো নয়, বক্সের বাইরে পাস দেওয়ার সঙ্গে সুইপারের ভূমিকাও নিয়েছেন। ব্যাপারটা শুধু মূল্যায়ন নয়, পারফরম্যান্স পরিমাপকের ক্ষেত্রেও সমস্যা। প্রত্যাশিত গোল (এক্সপেক্টেড গোল) মডেল মাঠে দলগুলোর তৈরি করা সুযোগের মান বুঝতে সাহায্য করেছে। আর শট-পরবর্তী প্রত্যাশিত গোলগুলোয় অনুমান করা যায় যে একজন গোলরক্ষক মুখোমুখি হওয়া শট এবং সেগুলোর পজিশন বিবেচনায় কতগুলো গোল আটকিয়েছেন। কিন্তু এগুলো ফুটিয়ে তুলতে ব্যাখ্যার প্রয়োজন আর গোলকিপার দলে যা কিছু অবদান রাখেন, তার সবটুকু এসব মেট্রিকস পুরোপুরি ফুটিয়ে তুলতে পারে না। ধরুন, একজন গোলকিপার যিনি প্রতিপক্ষের থ্রু পাস আগেই বুঝতে পেরে এগিয়ে যান এবং কেউ শটটি নেওয়ার আগেই বল বিপদমুক্ত করেন।

কিংবদন্তি কোচ ব্রায়ান ক্লফ নটিংহাম ফরেস্টের গোলকিপার পিটার শিলটনের গুরুত্ব সম্পর্কে একটি বিখ্যাত দাবি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, একজন ভালো মানের গোলকিপার মৌসুমে দলকে ১৫ থেকে ২০ পয়েন্ট পাইয়ে দিতে পারেন। গোলকিপার পেছনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন জেনে ডিফেন্ডাররা যেমন আত্মবিশ্বাসের সাথে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে পারেন, তেমনি দলের অন্যরাও মনে করেন একটি গোলই তাদের ম্যাচ জেতানোর জন্য যথেষ্ট। অথচ এই প্রভাবের সঠিক কোনো পরিমাপক নেই। অথচ সেবার ফাইনালের আগে জার্মান কিংবদন্তি দেখিয়ে দেন, গোলকিপারও বিশ্বকাপে পারফরম্যান্সে সবাইকে ছাপিয়ে যেতে পারেন। ভীষণ আগ্রাসী এক ‘দেয়াল’ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন জার্মানির পোস্টে।

ফুটবলে গোল হওয়ার মুহূর্তটি গ্যালারিতে যতটা গর্জন তোলে, গোল বাঁচানোর মুহূর্তটি ঠিক ততটা আলোড়িত করে না। খেলার ধরন এমন যে, একজন ফরোয়ার্ড সারাক্ষণ নিষ্ক্রিয় থেকেও শেষে একটি গোল করে নায়ক বনে যান, অন্যদিকে গোলকিপার ৮৯ মিনিট অসামান্য সেভ করেও একটি ভুলের কারণে ভিলেন হয়ে যান। গোলকিপারদের জন্য ২০১৯ সালে আলাদা করে ‘ইয়াশিন ট্রফি’ চালু করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মূল ব্যালন ডি’অর পাওয়ার পথ তাদের জন্য দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

গোলকিপারের অবদানকে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের সমান গুরুত্ব না দিলে ব্যালন ডি’অরে তারা কখনো প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারবেন না। তাদের ক্লিন শিট বা গোল ঠেকানোর পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে দলীয় কৌশলে তাদের ভূমিকা এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত কতটুকু প্রভাব ফেলছে, সেটি মূল্যায়নের জন্য নতুন মানদণ্ড তৈরি করা জরুরি। ফুটবল ইতিহাসের এই অসংগতি দূর না হলে গোলকিপাররা কেবল দর্শক হয়েই থেকে যাবেন, যা এই খেলার জন্য এক বেদনাদায়ক বাস্তবতা।

শেয়ার করুন