ট্রাম্পবাদ কি ফুরিয়ে এল? মার্কিন রাজনীতির ভবিষ্যৎ কোন পথে

প্রকাশ:

প্রায় চার দশক পর টেক্সাসে ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে মার্কিন সিনেট আসনে জয়লাভের পর নবনির্বাচিত সিনেটর জেমস ট্যালারিকো মার্কিন রাজনীতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে এক স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, একে অপরের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিষোদগার এবং ঘৃণা ছড়ানোর এই সংস্কৃতির প্রতি সাধারণ মানুষ এখন চরম বিরক্ত। তার মতে, গত এক দশক ধরে মার্কিন রাজনীতি এক ধরণের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং পেশাদার কুস্তির মতো অশালীন পর্যায়ে নেমে গেছে, যা পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সম্প্রতি প্রায় ৪০ বছর পর টেক্সাসে ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে প্রথম মার্কিন সিনেট সিটে জয়লাভের পর নবনির্বাচিত সিনেটর জেমস ট্যালারিকো বলেন, ‘আমার মনে হয় এটা নিশ্চিত যে আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে লাগাতার বিষোদ্‌গার সহ্য করতে করতে ক্লান্ত। প্রায় ১০ বছর ধরে এই ধারার রাজনীতি চলছে। রক্তক্ষয়ী খেলাধুলার রাজনীতি, ট্রলিং এবং অপরকে অপমান করার রাজনীতি, কিংবা পেশাদার রেসলিংয়ের মতো রাজনীতি। এটি পরিবারগুলোকে ভেঙে দিচ্ছে, বন্ধুত্ব ধ্বংস করছে এবং সব সময় আমাদের সবাইকে এক বিশ্রী অনুভূতিতে ডুবিয়ে রাখছে।’। আমি ট্যালারিকো বা তাঁর নীতিগুলোকে পছন্দ করি না। শ্রেণি–রাজনীতির হাতুড়িতে যেভাবে চুরমার হচ্ছে ট্রাম্পবাদ। ডোনাল্ড ট্রাম্প ডানপন্থীদের রাজনীতিতে এক দশক ধরে প্রভাব বিস্তার করার পর অনেক মার্কিন ভোটার ঠিক এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হয়েছেন বলে মনে হয়। ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে হোয়াইট হাউসের দৌড়ে যোগ দেওয়ার সাত বছর আগে সান ফ্রান্সিসকোতে এক ভাষণে বারাক ওবামা বলেছিলেন যে এ ধরনের মানুষেরা ‘হতাশ হয়ে পড়েন, তাই তাঁরা তাঁদের হতাশা দূর করতে বন্দুক, ধর্ম, অন্যদের প্রতি বিদ্বেষ, কিংবা অভিবাসী ও বাণিজ্যবিরোধী মনোভাব। এগুলো যেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি নয় কিংবা দামি বক্তৃতা লেখকদের লেখা নয়। মধ্যবর্তী নির্বাচনেই কি শেষ হবে ট্রাম্প-যুগ।

মার্কিন ভোটাররা বর্তমানে এমন নেতাদের খুঁজছেন যারা বিভাজন বাড়ানোর বদলে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক দশকের রাজনৈতিক প্রভাবের পর ভোটারদের এই মানসিক পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এক সময় যারা ট্রাম্পের অশালীন ও উসকানিমূলক বক্তব্য পছন্দ করতেন, তারাও এখন মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট জবাবদিহিতা চাইছেন। ট্রাম্পের সেই পুরনো কৌশল, যেখানে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের হেয় করে ডাকনাম দিতেন, তা এখন আর আগের মতো ভোটারদের মধ্যে সাড়া জাগাচ্ছে না। আমাদের এখন রিপাবলিকান পার্টি এবং সামগ্রিকভাবে মার্কিন রাজনীতিতে বিভাজন সৃষ্টিকারীদের চেয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে পারা নেতাদের বেশি প্রয়োজন। এগুলোর উদ্দেশ্যই ছিল প্রতিপক্ষকে হেয় করা। তাঁর অনুগত মাগা সমর্থকেরাই উপভোগ করতেন।

ট্রাম্পের উত্থানের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি ত্যক্ত-বিরক্ত ভোটারদের একছাতার নিচে এনে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা মাগা জোট গড়ে তুলেছিলেন। যেমন ‘ক্রুকেড হিলারি’, ‘লো-এনার্জি জেব’, ‘পোকাহন্টাস’, ‘লিটল মার্কো’, ‘ক্রেজি বার্নি’, ‘লাইং টেড’।

সেই সময় অবৈধ অভিবাসন রোধ ও বাণিজ্যনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি তৃণমূলের ভোটারদের আস্থা অর্জন করেছিলেন। এ যেন একেবারে নিম্নস্তরের এক সংঘাতের খেলা।

তবে ট্রাম্পের এই ধারা হোয়াইট হাউসের পুনর্নির্বাচনের সময় সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

এমনকি ক্যাপিটল হিলের ঘটনার পর আইনি লড়াই ও রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যেও তিনি অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের চার বছরের মেয়াদে ট্রাম্প আইনি আক্রমণ, কারাদণ্ডের হুমকি এবং হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে গিয়ে ২০২৪ সালে আবার ক্ষমতায় বসার মতো এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হন। তিনি আইনজীবীদের পরামর্শ নিয়েছিলেন, একটি বিতর্কিত আইনি কৌশল তৈরি করেছিলেন এবং তারপর ক্যাপিটল হিলে তাঁর সমর্থকদের লেলিয়ে দিয়েছিলেন।

তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়।

ট্রাম্প যখন দাবি করেন যে নির্বাচন চুরি হয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করেন, তখন ভোটাররা তার বিশৃঙ্খল স্টাইলকে প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করেন। বিশেষ করে, ট্রাম্প যখন পররাষ্ট্রনীতিতে অস্পষ্টতা প্রদর্শন করেন এবং ইরানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অকারণে যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করেন, তখন ভোটাররা তার প্রতি মোহভঙ্গ অনুভব করেন। ভাইস প্রেসিডেন্টও স্বীকার করেছেন যে এই যুদ্ধজনিত অস্থিরতা রিপাবলিকানদের পরাজয়ের একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প যখন দাবি করলেন যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাঁর পুনর্নির্বাচন চুরি করেছে, তখন তিনি কিন্তু চুপচাপ বসে থেকে ফল মেনে নেননি।

নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে রিপাবলিকানদের জন্য এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই পরাজয় কেবল নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীর নয়, বরং দলের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত একটি সামগ্রিক প্রত্যাখ্যান। প্রতিনিধি পরিষদের নেতা রিচার্ড হাডসন থেকে শুরু করে কেন প্যাক্সটন বা সুসান কলিন্সের মতো রক্ষণশীল ও ঐতিহ্যবাহী নেতারাও টিকতে পারেননি। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, ভোটাররা মাগা আদর্শের বিষাক্ত রাজনৈতিক আচরণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রায় দিয়েছেন।

বর্তমানে প্রশ্ন উঠছে, মাগা আন্দোলনের ভবিষ্যৎ আসলে কী? বিশ্লেষকদের মতে, রিপাবলিকানরা যদি তাদের যোগাযোগের মাধ্যম এবং প্রতিশ্রুতিগুলো মৌলিকভাবে পরিবর্তন করতে না পারেন, তবে ভবিষ্যতে যেকোনো নির্বাচনে জেতা তাদের জন্য কঠিন হবে। ডেমোক্রেটিক দলের এই বিজয় আসলে তাদের কোনো নীতির প্রতি সমর্থন নয়, বরং এটি ট্রাম্পের বিদ্বেষপূর্ণ রাজনীতির বিরুদ্ধে একটি গণভোট।

অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের মতোই ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার রাজনীতিকে চিরস্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে কোনো তিক্ততা ছাড়াই মতভেদ প্রকাশের সেই সোনালি অতীতে ফিরে যাওয়া হয়তো কঠিন। তবে এবারের নির্বাচনে ভোটাররা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তারা আর কটু কথা ও বিভাজনমূলক নাটকীয়তা সহ্য করতে রাজি নন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বার্তা বোঝাটাই এখন তার রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

শেয়ার করুন