দারিদ্র্য বিমোচনে আবাসন ঋণের ভূমিকা ও নতুন সম্ভাবনা

প্রকাশ:

আবাসন কেবল ইট-পাথরের দেয়াল বা ছাদ নয়, বরং এটি একটি পরিবারের নিরাপত্তা, ঠিকানা এবং সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। স্বল্প আয়ের মানুষরা যখন অনিরাপদ ঘরে বাস করেন, তখন বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের জীবনকে বারবার সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। সম্পদ নষ্ট হওয়া এবং নতুন করে ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে তারা এক অন্তহীন দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়েন। এই চক্র থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) আবাসন ঋণ ও জলবায়ু-সহনশীল বাসস্থানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য ঘরই জীবনের প্রথম ভিত্তি। দারিদ্র্য আর অনিরাপদ ঘর একে অপরের সঙ্গে জড়িত। দুর্নীতি দূর না করতে পারলে দারিদ্র্য হটবে না। এ বিষয়ে পিকেএসএফ ছয়টি কারণ চিহ্নিত করেছে। স্যাঁতসেঁতে ও ঘিঞ্জি ঘরে শ্বাসকষ্ট ও রোগ ছড়ায়।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাধারণত গরিব মানুষের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি বিবেচনায় নিয়ে ছোট অঙ্কের ঋণ দিতে অনাগ্রহী। এছাড়া জমির দলিল বা বন্ধক রাখার বাধ্যবাধকতা থাকে, যা অনেক প্রান্তিক মানুষের নেই। পিকেএসএফ এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সহজ শর্তে ও দীর্ঘমেয়াদী ঋণের ব্যবস্থা করেছে। ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘লো-ইনকাম কমিউনিটি হাউজিং সাপোর্ট প্রজেক্ট’ (এলআইসিএইচএসপি) শুরু হয়। এই প্রকল্পে ১৩টি শহরে সাতটি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে ২০২১ সালের মে পর্যন্ত ১২ হাজার ২ জন সদস্য ২৫৫ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছেন। এর মধ্যে ৫৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ ঋণ পেয়েছেন মাসিক ২৫ হাজার টাকা বা তার চেয়ে কম আয় করা পরিবার, যা ৪০ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। ৫৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ ঋণ গেছে স্বল্প আয়ের পরিবারে (যাদের মাসিক আয় ২৫,০০০ টাকা)। লক্ষ্য ছিল ৪০ শতাংশ। মেয়াদ প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণের তুলনামূলক দীর্ঘ, সুদের হার কম। ১৮টি সহযোগী সংস্থা এতে যুক্ত। বিশ্বব্যাংকের মিশন প্রকল্পটিকে ‘অত্যন্ত সন্তোষজনক’ বলেছে। ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি গাছ এরই মধ্যে লাগানো হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় ৭ জেলায় ৫০ হাজারের বেশি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রতি বন্যায় বা সাইক্লোনে ঘর মেরামতে টাকা গেলে স্কুলের খরচে কম পড়ে, অনেক সময় থাকে না। সেই সময় আরএইচএল ঘরে নিরাপদ ছিল ৭০০ পরিবার।

এলআইসিএইচএসপির ইতিবাচক অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় পিকেএসএফ ২০১৯ সালে নিজস্ব তহবিলে আবাসন ঋণ কর্মসূচি শুরু করে। জুন ২০২৬ পর্যন্ত ৪২টি জেলার ১৬০টি উপজেলায় ৩২টি সহযোগী সংস্থার ৩৬০টি শাখা এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এখন পর্যন্ত ৫২ হাজার ১৮৪টি পরিবার প্রায় ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকার এই ঋণের সুবিধা পেয়েছে। এর ফলে গৃহহীনরা নতুন ঘর নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো ঘর সংস্কার, পাকা অবকাঠামো তৈরি এবং স্যানিটেশন ও রান্নার জায়গার আধুনিকায়ন করতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে নিজের সামান্য সঞ্চয়ে অল্প অল্প করে ঘর তোলেন তাঁরা। পিকেএসএফ এই গ্যাপটি পূরণ করতে চেয়েছে। কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করা হচ্ছে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা ও কক্সবাজারের ২১টি উপজেলায়। ঘর পাকা হয়েছে, আলো-বাতাস ঢুকেছে, স্যানিটেশন ঠিক হয়েছে। রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, শ্রমিক ও নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসায়ী আয় করেন।

পিকেএসএফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আবাসন উন্নয়নের ছয়টি সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এটি পরিবারকে সামাজিক পরিচিতি দেয়, নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে এবং শিশুর পড়াশোনার জন্য উন্নত পরিবেশ তৈরি করে। এছাড়া স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে এটি একটি স্থায়ী সম্পদ হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি নির্মাণশিল্পে কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং ঘরের ভেতরেই ছোটখাটো কুটির শিল্প বা হাঁস-মুরগি পালনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ঘরের মালিকানা বা যৌথ মালিকানা থাকলে তাঁর দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ে।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক ঝুঁকির মুখে থাকায় প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকতে সহনশীল বসতভিটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের (জিসিএফ) সহায়তায় উপকূলীয় সাতটি জেলায় ‘রেজিলিয়েন্ট হোমস্টেড অ্যান্ড লাইভলিহুড সাপোর্ট টু দ্য ভালনারেবল কোস্টাল পিপল অব বাংলাদেশ’ (আরএইচএল) প্রকল্পের মাধ্যমে ৩ হাজার বসতভিটা তৈরির কাজ চলছে। প্রতিটি ঘরে উঁচু ভিটা, শক্ত কাঠামো, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, সৌরবিদ্যুৎ ও উন্নত চুলার ব্যবস্থা রয়েছে। ইতিমধ্যে সেখানে আড়াই লক্ষাধিক ঝড়-প্রতিরোধী গাছ লাগানো হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের মে মাসের ঘূর্ণিঝড়ে এই প্রকল্পের ঘরগুলো অনেক পরিবারকে সুরক্ষা দিয়েছে। এছাড়া লবণসহিষ্ণু সবজি ও আদা চাষের মতো আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েও সুবিধাভোগীরা লাভবান হচ্ছেন।

উত্তরাঞ্চলের বন্যাপ্রবণ এলাকায় ‘ইসিসিসিপি-ফ্লাড’ প্রকল্পের আওতায় ১৫ হাজার ৫৬৩টি ভিটা উঁচু করা হয়েছে। জিসিএফ ও পিকেএসএফের ১৩ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও জামালপুরে বাস্তবায়িত হয়েছে। একই ধরনের সিসিসি প্রকল্পের মাধ্যমে আরও ৫ হাজার ৭৫৯টি ভিটা উঁচু করা হয়েছে। এসব ভিটায় নিরাপদ পানির জন্য নলকূপ ও জলবায়ু-সহনশীল পায়খানা স্থাপন করা হয়েছে। নিরাপদ ও নিরিবিলি ঘর তাঁর মর্যাদা রক্ষা করে।

ভবিষ্যতে এই কার্যক্রমকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে এডিবি ১০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। ২০৩১ সালের মধ্যে এই কর্মসূচির মাধ্যমে অন্তত ৪০ হাজার পরিবার আবাসন ঋণের আওতায় আসবে, যার মধ্যে অন্তত ৩২ হাজার জন নারী। এছাড়া দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় ২৪ হাজার পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। স্বামী-স্ত্রী যৌথ মালিকানায় ঋণের আবেদনকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, যাতে নারীর আবাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। সামগ্রিকভাবে, সঠিক বিনিয়োগ ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে নিরাপদ আবাসন কেবল মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, বরং দারিদ্র্য জয়ের নতুন সাহস জোগাচ্ছে।

শেয়ার করুন