নিরাপত্তা সংকটে সৌদি: ইয়েমেন সংঘাতে হোঁচট ভিশন ২০৩০-এর

প্রকাশ:

দীর্ঘদিন ধরে সামরিক অভিযান ও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে ইয়েমেনের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে রাখার যে প্রচেষ্টা সৌদি আরব চালিয়ে আসছিল, তা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। অর্থনীতি, পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার যে ভিশন ২০৩০ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সৌদি আরব, ইয়েমেনের বর্তমান সংঘাত সেই পরিকল্পনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে রিয়াদের নিরাপত্তা কৌশল এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা নতুন করে পর্যালোচনার মুখে পড়েছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে দেশটির অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, পর্যটন এবং বড় ক্রীড়া আয়োজনের কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইরানের মিত্র হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান দিয়ে শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে রিয়াদ তাদের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় যায় এবং তেহরানের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে। একই সঙ্গে সৌদি জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ এবং লোহিত সাগরের ইয়েমেন উপকূলজুড়ে অভিযান শুরু করে তারা। কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

চলতি বছরের গ্রীষ্মে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আবারও তীব্র রূপ নিয়েছে, যা গত মাসে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। প্রায় ১১ বছর ধরে চলা এই সংঘাতের প্রেক্ষিতে সৌদি আরবের ধারাবাহিক কিছু কৌশলগত ভুল সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। বিশেষ করে, ইয়েমেনে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বে ফাটল ধরা রিয়াদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। গত বছর ইউএইর একটি সামরিক বহরে সৌদি যুদ্ধবিমানের হামলার ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কে চূড়ান্ত অবনতি ঘটায়, যার ফলে আবুধাবি তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউএইর সেনারা চলে যাওয়ার সময় দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা জানান, ইউএইর সুশৃঙ্খল কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সরে যাওয়ার পর সৌদি আরব তার যোগ্য বিকল্প গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে সৃষ্ট ক্ষমতার শূন্যতা পূরণে ব্যর্থ রিয়াদ এবং তাদের নতুন কৌশলের সঙ্গে স্থানীয় যোদ্ধাদের খাপ খাইয়ে নিতে না পারার সুযোগ নিয়েছে হুতিরা। এটি ২০২২ সালের পর ইয়েমেনে সবচেয়ে বড় সংঘাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আবুধাবির অধীনে দীর্ঘদিন লড়াই করা হাজারো যোদ্ধাও সৌদির নতুন কৌশলের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেননি।

ইয়েমেনে হুতিদের আকস্মিক এই আক্রমণাত্মক অবস্থানের জন্য সৌদি আরব মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না বলে মত দিয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি। তিনি জানান, সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সাথে সমন্বয়ের অভাব এবং কৌশলগত অঞ্চলগুলো হাতছাড়া হওয়ায় সামরিক মনোবল ভেঙে পড়েছে। এর পাশাপাশি হুতিদের হাতে চলে আসা উন্নত প্রযুক্তির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখন সরাসরি সৌদি ভূখণ্ডে আঘাত হানছে, যার ফলে তেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে তেলের দামের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন হুতিরা সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো ও পাইপলাইনে হামলা চালায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের সামরিক নির্ভরতাও সৌদি আরবের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ মর্যাদা পাওয়ার পরও নিরাপত্তার বিষয়ে মার্কিন প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ায় রিয়াদ বর্তমানে গভীর হতাশায়। সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুই দফা ফোনালাপে হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হামলার অনুরোধ জানালেও ওয়াশিংটন তা প্রত্যাখ্যান করে। এর পরিবর্তে মার্কিন নীতি এখন ওমানে হুতিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার দিকে ঝুঁকেছে।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি মনে করেন, সৌদি সামরিক কাঠামো মূলত মার্কিন অংশীদারিত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়া, তাই এককভাবে বড় ধরনের যুদ্ধ পরিচালনার প্রস্তুতি তাদের নেই। এই নাজুক পরিস্থিতিতে রিয়াদ এখন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মিত্রদের সহযোগিতা চাইছে। এর অংশ হিসেবে সৌদি যুবরাজ মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদকে রিয়াদে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

সামরিক সহায়তা হিসেবে ফ্রান্স প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাঠাতে সম্মত হয়েছে। যুক্তরাজ্য সৌদি যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহের জন্য উড়োজাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে এবং ১০০ জনেরও বেশি মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করছেন। এছাড়া, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

তবে সামরিক বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা হলো, কেবল বাইরের দেশের সহায়তা বা অস্ত্র সরবরাহ দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের উপদেষ্টা হিশাম আল-ওমাইসির মতে, সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটানো এবং পুনর্দখল করা অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

সবশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হুতিদের সাম্প্রতিক হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন এবং চারজন বাংলাদেশি হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় ঢাকা থেকে কয়েক হাজার প্রবাসী শ্রমিক বর্তমানে আটকে পড়েছেন। ইয়েমেনের এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বরং সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সংস্কারের পথেও দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শেয়ার করুন