সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’র মূল নথি আঙ্কারার পার্লামেন্টে উত্থাপন করেছে তুর্কি সরকার। লন্ডনভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত আগস্টে তিন দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন আন্তর্জাতিক সামরিক রূপরেখা তৈরি হলো। তবে এর জন্য অন্য দেশগুলোকে অন্তত তিন মাস আগে লিখিতভাবে নিজের ইচ্ছার কথা জানাতে হবে। মক্কা চুক্তি: নয়া আঞ্চলিক নিরাপত্তার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ।
মোট ১৬টি অনুচ্ছেদবিশিষ্ট এই প্রতিরক্ষা চুক্তির কোনো নির্দিষ্ট সমাপ্তির তারিখ বা মেয়াদ নির্ধারিত নেই। ১৬ অনুচ্ছেদের এই চুক্তির মূল নথিতে সরাসরি নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা শক্তির নাম উল্লেখ করা না হলেও জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, কোনো শরিক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা কিংবা সীমানা হুমকির মুখে পড়লে সম্মিলিত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চুক্তির ১ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শরিক যেকোনো দেশের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমানা কিংবা সার্বভৌমত্বে আঘাত এলে বা হুমকি দেখা দিলে তা প্রতিহত করা হবে। যদি কোনো শরিক দেশ অন্য কোনো রাষ্ট্র বা জোটের মাধ্যমে সশস্ত্র হামলার মুখোমুখি হয়, তবে বাকি সদস্যরা অবিলম্বে সহায়তায় এগিয়ে আসবে এবং তাদের সামরিকসহ সব ধরনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কাজে লাগাবে।
নেটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চুক্তির ২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাইরে থেকে যেকোনো একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সামরিক হামলা চালানো হলে তা জোটের সব দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। অনেকটা ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ এর মতো।
এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের জন্য সহমর্মী দেশগুলো সামরিক শক্তি ও উপলব্ধ অন্যান্য সমস্ত উপায় ব্যবহার করে যৌথ সহায়তা নিশ্চিত করবে।
সহায়তার ধরণ ও পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে একটি নিরপেক্ষ পর্যালোচনার মাধ্যমে।
সামরিক ও নিরাপত্তা সহায়তার পাশাপাশি তিন দেশের মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর সম্পর্ক জোরদার, যৌথ প্রশিক্ষণ, সামরিক সরঞ্জাম, জ্বালানি ও আনুষঙ্গিক প্রতিরক্ষা সামগ্রী আদান-প্রদানের বিষয়ে চুক্তিটিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ এবং নিজস্ব প্রযুক্তি ভাগাভাগির জন্য বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। সরঞ্জাম ও রসদ সহায়তার প্রাপ্যতা ও উপযোগীতার ওপর ভিত্তি করে যুদ্ধ, শান্তি কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে দেশগুলো একে অপরকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, জ্বালানি, খুচরা যন্ত্রাংশসহ প্রয়োজনীয় রসদ সহায়তা দেবে।
প্রতিরক্ষা শিল্পে অংশীদারিত্ব বাড়াতে চুক্তিটিতে পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্রের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে সচিবালয় পরিচালন সংক্রান্ত নিয়ম, কাঠামো ও মূল নীতিগুলো পরে প্রধান দেশগুলোর সর্বসম্মতিতে ঠিক করা হবে।
- প্রতিরক্ষা খাতে যৌথ উৎপাদনের উদ্যোগকে উৎসাহ দেওয়া।
- বিশেষায়িত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যৌথ গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনী প্রকল্প বাস্তবায়ন করা।
- চুক্তিবদ্ধ দেশের সামরিক বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সামরিক শিল্পের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা।
- প্রতিরক্ষা গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও অর্জিত অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান করা।
- পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নির্ধারিত অন্যান্য সুবিধাজনক ক্ষেত্র।
চুক্তিটির সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা, নীতি নির্ধারণ ও বাধা নিরসনে ‘কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিটির পরিচালনাসংক্রান্ত রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো
- চুক্তি বাস্তবায়ন, নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি ও সম্ভাব্য সমস্যা সমাধানে কোর পার্টিসমূহের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সেনাপ্রধানদের নিয়ে একটি ‘কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি’ গঠন করা হবে।
- প্রয়োজনানুসারে এই কমিটি প্রয়োজনীয় সাব-কমিটি গঠন করতে পারবে।
- চুক্তির লক্ষ্য অর্জনে সদস্য দেশগুলো পরস্পরের মধ্যে পৃথক চুক্তি বা প্রোটোকল বাস্তবায়ন করতে পারবে।
- কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নতুন কোনো রাষ্ট্রকে এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম ও নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে।
- কমিটির প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে সৌদি আরবে একটি স্থায়ী সচিবালয় স্থাপন করা হবে, যার কার্যপ্রসূ নীতি পরবর্তীতে যৌথভাবে নির্ধারিত হবে।
- সচিবালয়ের শীর্ষ পদ ‘মহাসচিব’ তিন বছরের মেয়াদে শরিক দেশগুলোর মধ্যে পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হবে। চুক্তি অনুযায়ী প্রথম মহাসচিব হবেন পাকিস্তানের একজন নাগরিক।
- এই অনুচ্ছেদের কোনো বিধান সদস্য দেশগুলোর অন্য কোনো বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতা কমিটিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না।
প্রতিরক্ষা ও সামরিক নথিপত্র সুরক্ষায় গোপনীয়তার ওপর সর্বোচ্চ কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। এই বিষয়ে নির্ধারিত শর্তগুলো হলো
- চুক্তির মাধ্যমে সংগৃহীত ও বিনিময়ানুক্রান্ত সমস্ত তথ্য ও দলিলাদির সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা করতে সব দেশ বাধ্য থাকবে এবং নিজ দেশের জাতীয় আইন অনুসরণ করবে।
- কোনো অবস্থাতেই এই গোপন তথ্য তৃতীয় কোনো রাষ্ট্র, বেসরকারি কোম্পানি বা ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করা যাবে না।
- শুধুমাত্র যাদের প্রয়োজনীয় সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স আছে এবং দাপ্তরিক প্রয়োজনে জানা অপরিহার্য (নিড-টু-নো), তারাই এসব নথিপত্র পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
চুক্তির অনুমোদন, কার্যকারিতা ও মেয়াদ অবসানের নিয়মাবলিও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে
- প্রতিটি দেশ তাদের নিজ নিজ সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চুক্তিটি অনুমোদন করবে। আঙ্কারা বা নির্ধারিত সচিবালয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের নথি জমা দেওয়ার দিন থেকেই এটি কার্যকর হবে।
- এই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বলবৎ থাকবে।
- চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর ন্যূনতম ১০ বছর অতিক্রান্ত হলে, যেকোনো দেশ ৩ মাস আগে লিখিত কূটনৈতিক নোটিশ প্রদানের মাধ্যমে এটি থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করতে পারবে।
- কোনো দেশের প্রত্যাহার বা চুক্তির অবসান হলেও পূর্বে গৃহিত বা চলমান কোনো যৌথ প্রকল্প ব্যাহত হবে না।
- তথ্য গোপনীয়তা রক্ষার আইনি বাধ্যবাধকতা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সব দেশের ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য থাকবে।
চুক্তির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, তুর্কি, পাকিস্তান ও সৌদি আরব একে অপরের স্বাধীনতা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও জাতিসংঘ সনদের নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে তথ্য বিনিময় এবং যৌথ প্রতিরক্ষার কৌশল বাস্তবায়নে দেশগুলো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই কমিটির বৈঠক বছরে দুবার অনুষ্ঠিত হবে এবং দেশগুলো পর্যায়ক্রমে আয়োজক হবে। প্রয়োজন মনে করলে দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা বছরে একবার বৈঠক করতে পারেন।
সূত্র: গালফ বাংলা








