চালুর তিন বছরের মাথায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের বিভিন্ন অংশ ভারী বর্ষণের মুখে পড়ে বারবার তলিয়ে যাচ্ছে। কোথাও মাটি ও পাথর সরে গিয়ে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, আবার কোথাও পানির উচ্চতা বাড়লে ট্রেন চলাচল স্থগিত রাখতে হচ্ছে। সর্বশেষ গত জুলাই মাসে চট্টগ্রাম শহরের শমসের পাড়া এলাকায় রেললাইনের ওপর দিয়ে ২১ ইঞ্চি পর্যন্ত পানি প্রবাহিত হয়। এই পরিস্থিতিতে কক্সবাজার রুটের ট্রেন চলাচল পাঁচ দিন বন্ধ রাখতে হয়েছিল। বন্যার হাত থেকে রেলপথকে সুরক্ষিত রাখতে এখন চট্টগ্রাম অংশের প্রায় ৪৭ কিলোমিটার পথ আরও পাঁচ ফুট উঁচু করার বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০২৬ সালের জুলাই মাসে, যখন টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম শহরের ষোলশহর থেকে জানআলীহাট অংশের একটি নির্দিষ্ট স্থান প্লাবিত হয়। জানআলীহাট স্টেশন থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পূর্বে শমসের পাড়ায় ৫০০ মিটার দীর্ঘ রেলপথ পানির নিচে তলিয়ে যায়। পানির প্রবল স্রোতে রেললাইনের নিচের ব্যালাস্টও সরে যায়। এর আগে কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেসসহ একাধিক ট্রেনের যাত্রা বাতিল বা মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল রেলওয়ে। অবশ্য ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের সময় তাৎক্ষণিকভাবে ৩০০ মিটার রেলপথ স্থানভেদে দেড় ফুট উঁচু করা হয়েছিল।
এর আগে ২০২৩ সালে নির্মাণাধীন দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের সাতকানিয়ার তেমুহুনি এলাকায় বন্যায় প্রায় ৪৫০ মিটার রেলপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান জানিয়েছিলেন, নির্মাণের সময় গত ১০০ বছরের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের তথ্য বিশ্লেষণ করে রেললাইন প্রায় ২০ ফুট উঁচু করা হয়েছিল। সেই সময় স্থানীয় বাসিন্দারা রেললাইনের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ তুললেও, প্রকল্প পরিচালক তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন যে নকশায় পর্যাপ্ত কালভার্ট ও ব্রিজ রাখা হয়েছে। এবারের জলাবদ্ধতার ঘটনাটি মূলত পুরনো ষোলশহর-দোহাজারী অংশে ঘটেছে, যা নতুন করে সংস্কার করা হবে।
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জুলাইয়ের জলাবদ্ধতার পর সরেজমিন পরিদর্শন করে ৪৭ কিলোমিটার অংশ পাঁচ ফুট উঁচু করার ঘোষণা দেন। তার ভাষ্যমতে, ভবিষ্যতে পানির উচ্চতা আরও তিন ফুট বাড়লেও যাতে ট্রেন চলাচল ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করাই এই প্রকল্পের লক্ষ্য। তিনি দাবি করেন, রেললাইন নির্মাণে কোনো ত্রুটি ছিল না। বর্তমানে প্রকল্পের পরিচালক আসাদুল হক জানিয়েছেন, মন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী মাসে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হবে। ওই প্রতিষ্ঠানের জরিপের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে কোন ৪৭ কিলোমিটার অংশে এই উচ্চতা বৃদ্ধির কাজ কার্যকর হবে।
পূর্বের শতবর্ষী পরিকল্পনায় কেন ত্রুটি দেখা দিয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রকল্প পরিচালক বলেন, বাংলাদেশে জলবায়ু ও ঋতু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার ধরণ বদলেছে। তাই এবার ১৫০ বছরের বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে রেলপথ উঁচু করা হচ্ছে। সমস্যা চিহ্নিত করতে রেলওয়ের নকশা, ফিনিশড গ্রাউন্ড লেভেল এবং সর্বোচ্চ বন্যার পানির উচ্চতার তথ্য সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। একইসঙ্গে দোহাজারী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রতিটি খাল, ছড়া ও প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহের পথের ওপর কালভার্টের অবস্থান ও আকার নকশার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।
বিশেষ করে সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, দোহাজারী এবং শহরের ষোলশহর-জানআলীহাট এলাকাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সমস্যাটি শুধুমাত্র লাইনের ওপর পানি ওঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পানির তীব্র স্রোত রেললাইনের নিচের কাঠামোর ওপর যে চাপ সৃষ্টি করছে, তা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির কারণ হতে পারে। বর্ষায় পাহাড়ি ঢল কোন দিক থেকে আসছে এবং কোথায় পানি আটকে যাচ্ছে, তা মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর–জানআলীহাট অংশের একটি জায়গায় পানি ওঠে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে কোন ৪৭ কিলোমিটার পাঁচ ফুট উঁচু হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি রেলওয়ে।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ








