দেশজুড়ে ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়া নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসি) একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেসব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, সেখানে বাদ পড়া বৈধ ভোটারদের পুনরায় তালিকায় ফিরিয়ে আনতে একটি বিশেষ অভিযান চালানো হবে। এই প্রক্রিয়ায় জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা (ডিইও) এবং ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের (ইআরও) নেতৃত্বে বাদ পড়া বৈধ নাগরিকদের খুঁজে বের করে তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা করা হবে। এই সার্বিক প্রতিরোধের মুখেই নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করা হচ্ছে। কমিশনের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, শুধু বাদ পড়া ভোটাররাই যে আবেদন করবেন তা নয়, কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিআরও, ইআরও ও মুখ্য নির্বাচনী আধিকারীকদেরও খুঁজে দেখতে হবে, এসআইআরের পরও কোনো বৈধ নাগরিকের নাম বাদ গেছে কি না।
এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইতিমধ্যেই ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। যদিও কমিশন বলছে, এই তালিকার মধ্যে মৃত, স্থানান্তর হওয়া বা একাধিক স্থানে নাম থাকা ব্যক্তিরা রয়েছেন, তবে বিরোধীদের অভিযোগ, সুকৌশলে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের লক্ষ্যে বহু বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে। এই বিতর্কিত প্রক্রিয়ার মূল হোতা হিসেবে বিরোধী দলগুলো মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে দায়ী করছে। অভিযোগ রয়েছে, শাসক দল বিজেপির জয় নিশ্চিত করতেই তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। শুরু হয় দেশজোড়া প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও বিক্ষোভ।
কমিশনের অভ্যন্তরেও এই নিয়ে ব্যাপক দ্বিমত রয়েছে। গত ১০ মাসে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি জ্ঞানেশ কুমারের কার্যপদ্ধতি নিয়ে মোট ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। বিরোধীদের পক্ষ থেকে জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের জোরালো দাবি তোলা হয়েছে। চাপের মুখে পড়া কমিশন এখন নির্দেশ দিয়েছে, ব্লক লেভেল অফিসারদের (বিএলও) মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বৈধ ভোটারদের চিহ্নিত করতে হবে। কোনো বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়ে থাকলে তাঁদের কাছ থেকে ফর্ম ৬ পূরণ করিয়ে নাম অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। জ্ঞানেশের অপসারণের দাবিতে বিরোধীরা সরব। প্রয়োজনে তাঁদের বাড়িতে গিয়ে ফর্ম ৬ ভরিয়ে আবার নাম তুলতে হবে।
পরিসংখ্যান বলছে, এসআইআর পরবর্তী ভোটার তালিকা কার্যত ২০১৫ সালের অবস্থায় ফিরে গেছে। ২০১৪ সালে ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার সংখ্যা ছিল ৭৬ কোটি ৬০ লাখ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ৯২ কোটি ৮০ লাখ হয়েছিল। কিন্তু এসআইআরের খসড়া তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে সেখানে বৈধ ভোটার দাঁড়িয়েছে ৮১ কোটি ৭৯ লাখ, যা ২০১৫ সালের ৮১ কোটি ৬৯ লাখের চেয়ে মাত্র ১০ লাখ বেশি। মহারাষ্ট্রে ভোটার তালিকা থেকে ২১ শতাংশ, গুজরাটে ১৪ শতাংশ এবং তামিলনাড়ুতে ১৫ শতাংশ ভোটারের নাম বাদ পড়ার তথ্য সামনে এসেছে।
পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্ব এই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের স্পষ্ট অভিযোগ তুলেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের জেতা এলাকাগুলোতে রেকর্ড সংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কলকাতায় ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৬৭৮ ভোটের ব্যবধানে জয় পেলেও সেখানে ৬ লাখ ৯৭ হাজার ১৬০ জনের নাম কাটা গেছে। উত্তর চব্বিশ পরগনায় তৃণমূলের জয়ের মার্জিন ছিল ৯ লাখ ১৩ হাজার ৯৪৩ ভোট, সেখানে বাদ পড়েছে ১২ লাখ ৬০ হাজার ৯৬ জনের নাম। একইভাবে নদিয়া জেলায় জয়ের মার্জিন ২০ হাজার ৯০৩ হলেও সেখানে ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৫৬৫ জন ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।
বিরোধী দলগুলোর মতে, এই এসআইআর প্রক্রিয়া অবাস্তব এবং অসাংবিধানিক। বিজেপির পক্ষ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার যে দাবি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে, তার কোনো অকাট্য প্রমাণ বা পরিসংখ্যান নির্বাচন কমিশন আজ পর্যন্ত দাখিল করতে পারেনি। কতজন বিদেশি বা অনুপ্রবেশকারীর নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেই স্বচ্ছ হিসাব দিতেও কমিশন ব্যর্থ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নাগরিক সমাজ ও বিরোধী শিবিরের চাপের মুখে কমিশন শেষ পর্যন্ত বৈধ ভোটারদের ফিরিয়ে আনার এই দায়সারা পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। সেই খবর প্রকাশ্যে আসতেই বিরোধীরা হাতে নতুন অস্ত্র পেয়েছেন।
সূত্র: প্রথম আলো








