মৌলভীবাজার শহরতলির বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক-সংলগ্ন বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় প্রাঙ্গণে এক বিরল সিঁদুরগাছে এখন গোলাপি-সাদা ফুল ও লালচে ফলের সমাহার। গত ১৫ অক্টোবর সরেজমিনে দেখা যায়, গাছটির কোনো কোনো ডালে ফুল ফুটে আছে, আবার কোথাও কেবল কুঁড়ি দেখা দিয়েছে। পাশপাশি নরম কাঁটাযুক্ত লালচে ফলগুলো রোদে ঝলমল করছে। দূর থেকে এই কাঁটাগুলোকে লোমশ মনে হয়। প্রায় ১০-১২ বছর ধরে বিভাগীয় কার্যালয়ের আঙিনায় গাছটি রয়েছে এবং প্রতিবছরই এতে ফুল ও ফল আসে। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, গাছটিতে ফুল-ফল কিছুই আসেনি। কয়েক দিন আগে তিনি জানালেন, গাছটিতে ফুল এসেছে।
গাছটির পরিচয় ও বৈজ্ঞানিক নাম ‘Bixa orellana’ উল্লেখ করে গোড়ায় একটি নেমপ্লেট সাঁটানো আছে। এটি মূলত আমেরিকা অঞ্চলের চিরসবুজ ছোট গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে স্প্যানিশদের হাত ধরে এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়ভাবে এটি দইগোটা, লটকনগোটা, রংগোটা, সিঁদুরি বা সিন্দুরে ফুল নামে পরিচিত হলেও অনেকে ভুল করে একে জাফরান ফুল বলে ডাকেন। যদিও জাফরানের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। ইংরেজি ভাষায় এটি বিশ্বজুড়ে ‘লিপস্টিক ট্রি’ নামে পরিচিত। নেমপ্লেটে লেখা নাম ছাড়াও এই গাছের বিভিন্ন ধরনের নাম আছে। একেকজনের কাছে একেক রকম পরিচয় গাছটির। গাছটি ছোট, ঝোপাল, চার থেকে পাঁচ মিটার উঁচু ও চিরসবুজ প্রকৃতির একটি গাছ।
বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মির্জা মেহেদী সরোয়ার জানান, দইয়ের রঙ করার জন্য এর নির্যাস ব্যবহৃত হয় বলেই এটি মূলত দইগোটা নামে পরিচিতি পেয়েছে। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর বীজ। ফলগুলো লালচে বাদামি রঙের হয় এবং ভেতরে থাকা বীজগুলো লাল শাঁসে জড়ানো থাকে। এই বীজ থেকে উৎকৃষ্ট মানের প্রাকৃতিক রঞ্জক পাওয়া যায়, যা বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য রাঙাতে ব্যবহৃত হয়। শরৎকাল থেকে শীতের প্রথম ভাগ পর্যন্ত এই গাছে ফুল ফোটার উপযুক্ত সময়।
হবিগঞ্জের বৃন্দাবন সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক সুভাষ চন্দ্র দেব জানান, এটি একটি বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ গুল্ম।
এর বীজ থেকে লালচে কমলা রঙের প্রাকৃতিক খাদ্য রং ও মসলা পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকভাবে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ধর্মীয় আচার, প্রসাধনী, সানস্ক্রিন, কীটপতঙ্গ প্রতিরোধক এবং চিকিৎসায় এই গাছটির ব্যবহার ছিল। বর্তমানে বৈশ্বিক খাদ্যশিল্পে কৃত্রিম রাসায়নিকের বিকল্প হিসেবে দই, পনির, মাখন, আইসক্রিম ও বেকারি পণ্যে এই প্রাকৃতিক রঞ্জক অত্যন্ত জনপ্রিয় ও নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃত। রঙের নান্দনিকতার কারণে এই গাছে ফুলের চেয়ে ফলের পরিচিতিই বেশি বিস্তৃত হয়েছে।
সূত্র: প্রথম আলো








