রাজশাহীর পদ্মায় প্রতিনিয়ত ঘটছে নানা দুর্ঘটনা, যা এখন বিনোদনপ্রেমী ও স্থানীয়দের জন্য এক বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত এক দশকে এই নদীতে দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। নৌকাডুবি, গোসলের সময় ডুবে যাওয়া কিংবা তীব্র স্রোতের টানে এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান না পাওয়ায় সরকারি হিসাবের বাইরেও রয়ে গেছে বহু মৃত্যুর তথ্য। গত পাঁচ বছরে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর মিলিয়ে পদ্মায় ৬১টি নৌকাডুবির ঘটনায় অন্তত ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৪০টি ঘটনাই ঘটেছে রাজশাহীতে।
রাজশাহীর পদ্মায় গত পাঁচ বছরে খেয়া পারাপার, নৌকাডুবি ও গোসল করতে গিয়ে অন্তত ৫৭ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু গোসল করতে নেমে মারা গেছেন ১৪ জন এবং নৌকা ভ্রমণ বা খেয়া পারাপারের সময় নৌকাডুবিতে প্রাণ হারিয়েছেন নয়জন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে পদ্মা থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের সাতটি অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন, নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব এবং লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার না করার প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্ষাকালে নদীর পানি বাড়লে তীব্র স্রোত ও ঘূর্ণাবর্তের কারণে ছোট নৌকায় চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক একটি মর্মান্তিক ঘটনায় গত ৩০ জুলাই পদ্মায় নৌকাডুবির দুদিন পর বাবা কাওসার আলী (৬০) ও তার তিন বছরের ছেলে জিয়ারুল হকের লাশ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় নৌকাডুবিতে স্বামী ও সন্তানকে হারিয়ে জাহেরা বেগম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। এছাড়া গত ২৮ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের দেবীনগর ইউনিয়নের চর-চাকলা গ্রামে পদ্মায় ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়। এর আগে গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর একই এলাকায় ডিঙি নৌকা ডুবে তিনজনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে, যাদের দীর্ঘ প্রচেষ্টাতেও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
রাজশাহীর প্রায় ১০০ কিলোমিটার পদ্মাপাড় এখন নগরবাসীর প্রধান বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের তথ্যমতে, নদীতে প্রায় ৫০০ ভ্রমণ নৌকা চলাচল করে। তবে নিরাপত্তার অভাব থাকায় আনন্দের ভ্রমণ প্রায়ই বিষাদে রূপ নিচ্ছে। নগরীর শ্রীরামপুর এলাকায় গোসলে নেমে গত দুই বছরে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে, যা ডুবুরিদের মতে পদ্মার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ স্থান। ২০২০ সালে একই এলাকায় নৌকাডুবিতে নববধূসহ নয়জনের প্রাণহানি ঘটেছিল।
রাজশাহী ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক জানান, গত পাঁচ বছরে চার জেলায় পদ্মায় ৬১টি নৌদুর্ঘটনার তথ্য তাদের কাছে রয়েছে, যাতে প্রায় ৭০ জন মারা গেছেন। নদী বিশেষজ্ঞ মাহবুব সিদ্দিকীর মতে, ঘূর্ণাবর্ত, তীব্র স্রোত, সাঁতার না জানা এবং অভিভাবকদের অসচেতনতা প্রাণহানির প্রধান কারণ। তিনি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড স্থাপন এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহনকারী নৌকার বিরুদ্ধে নিয়মিত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
রাজশাহী অঞ্চলের নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন জানান, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে এবং নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক বাবা-ছেলে নিহতের ঘটনায় অতিরিক্ত যাত্রী বহনের বিষয়টি সামনে আসায় সংশ্লিষ্ট নৌকার বিরুদ্ধে জরিমানা করা হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, কেবল এক-দুদিনের অভিযান দিয়ে দুর্ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব নয়, এর জন্য ধারাবাহিক নজরদারি প্রয়োজন।
রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম জানান, নৌ-দুর্ঘটনা রোধে মাঝি ও বিনোদনপ্রেমীদের সচেতন করতে পদ্মাপাড়জুড়ে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ ও নৌযানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ চলমান রয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বড় কোনো দুর্ঘটনার পর প্রশাসন তৎপর হলেও দীর্ঘমেয়াদে সুপারিশ বাস্তবায়নের ঘাটতি থেকে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা ও ভ্রমণকারীরা বলছেন, দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান নয়, বরং দুর্ঘটনা ঘটার আগেই স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। নৌকার ধারণক্ষমতা নির্ধারণ, লাইফ জ্যাকেট বাধ্যতামূলক করা এবং প্রশিক্ষিত মাঝি নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন তারা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সৌন্দর্যের আড়ালে ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠেছে পদ্মা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নিহতরা হলেন কাটাখালীর শ্যামপুর শান্তিনগর এলাকার নৌকার মাঝি কাওসার আলী (৬০) ও তার তিন বছরের ছেলে জিয়ারুল হক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: স্বজনদের অভিযোগ, তিন দিক থেকে স্রোত এসে ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হলে মুহূর্তের মধ্যে ডুবে যায় নৌকাটি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জেলার প্রায় ১০০ কিলোমিটার পদ্মাপাড়জুড়ে প্রতিদিনই মানুষের ভিড় থাকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ নৌকায় ঘুরতে বের হন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পদ্মায় বড় দুর্ঘটনা ঘটলেই প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি, আসে নানা সুপারিশ।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ








