রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতিদের হামলা: নিহত ১২, স্থগিত কার্যক্রম

প্রকাশ:

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। এই হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ৫০ জন। গত শনিবারের এই হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিন কর্মকর্তা। হামলার পরপরই সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরের সব ধরনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, বর্তমানে বিমানবন্দরের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে। সৌদির বিমানবন্দরে বিস্ফোরণ, বাংলাদেশ বিমানের রিয়াদগামী দুটি ফ্লাইট স্থগিত। রিয়াদ বিমানবন্দরে আবারও হামলা, উড়োজাহাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, চলতি সপ্তাহের শুরুতে রিয়াদ ও দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর আভার বিমানবন্দরেও হামলা চালিয়েছিল হুতিরা।

পশ্চিমা ও আরব বিশ্বের তিন কর্মকর্তার বরাতে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে চলমান সংঘাতের মধ্যে উপসাগরীয় কোনো আরব দেশে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা। নিরাপত্তা ও সংবেদনশীলতার কারণে ওই কর্মকর্তারা নিজেদের নাম প্রকাশ না করার শর্ত দিয়েছেন। হামলার পরপরই বিমানবন্দরের দিকে অন্তত ছয়টি অ্যাম্বুলেন্স দ্রুতগতিতে ছুটে যেতে দেখেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা, একই সঙ্গে পুলিশ বিমানবন্দরের প্রবেশপথগুলো বন্ধ করে দেয়।

এই হামলার দায় স্বীকার করেছেন হুতিদের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি। তাঁর দাবি, ইয়েমেনের বেসামরিক স্থাপনায় সৌদি আরবের চলমান বোমাবর্ষণের জবাব হিসেবেই এই পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আল-বুখাইতির ভাষায়, ইয়েমেনের বাজার, হাসপাতাল, বিয়ের অনুষ্ঠান কিংবা শোকসভার হল যে নিয়ম অনুযায়ী সংরক্ষিত থাকা উচিত, বিশ্বের অন্য প্রান্তের স্থাপনার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া প্রয়োজন। সৌদি যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বলে হুতিদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, যেখানে শিশুসহ অনেক বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় রিয়াদের এই বিমানবন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, চলতি সপ্তাহের ধারাবাহিক এসব হামলা রিয়াদকে আন্তর্জাতিক ব্যবসার কেন্দ্রে রূপান্তরের যুবরাজের লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এছাড়া আগামী কয়েক সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আয়োজনের ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। রিয়াদে আজ রোববার থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে বিশ্ব পেট্রোলিয়াম কাউন্সিলের ‘ডব্লিউপিসি এনার্জি কংগ্রেস’। আয়োজকরা জানিয়েছেন সম্মেলন সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হলেও বিকল্প যাতায়াত ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, কিছু ফ্লাইটের গতিপথ এরই মধ্যে পরিবর্তন করা হয়েছে।

এই উত্তেজনার মধ্যেই চলতি মাসের শেষ দিকে রিয়াদে যুবরাজের বার্ষিক বিনিয়োগ সম্মেলন ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে বিশ্বের শীর্ষ বিনিয়োগকারী ও নেতাদের উপস্থিত থাকার কথা। সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসসহ পশ্চিমা মিশনগুলো তাদের নাগরিকদের সতর্ক থাকার এবং ওই এলাকা এড়িয়ে চলার নির্দেশনা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তারা সাম্প্রতিক এই হামলার বিষয়ে অবহিত এবং এ ব্যাপারে দ্রুত একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে মার্কিন হস্তক্ষেপের ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেননি তিনি। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় তাঁরা পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। সে সময় ট্রাম্প দ্রুত বিজয়ের ঘোষণা দিলেও প্রথম মাসেই প্রায় ১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করেছিল মার্কিন বাহিনী। তবে সেই অভিযান শেষ পর্যন্ত বিপর্যয়কর হয়ে ওঠে।

২০১৫ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর থেকে সৌদি আরব ও হুতিদের সংঘাত ভয়াবহ রূপ নেয়। মাঝখানে ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি দিয়ে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও গত জুলাই থেকে উত্তেজনা পুনরায় বৃদ্ধি পায়। গত সপ্তাহে সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকার হুতিদের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযানের ঘোষণা দিলে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েও হুতিদের সঙ্গে সংঘাত ছড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দশকের দীর্ঘ যুদ্ধে হুতিরা আরও কঠোর অবস্থানে চলে গেছে এবং তারা এখন আলোচনার চেয়ে শক্তির লড়াইকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে, যা সংকটের রাজনৈতিক সমাধানকে ক্রমশ কঠিন করে তুলছে।

শেয়ার করুন