যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধরনের পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে রদবদলের গুঞ্জন উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দায়িত্ব ছাড়তে পারেন—এমন খবর জোরালোভাবে নাকচ করেছে হোয়াইট হাউস। সরকারি সূত্রগুলো বলছে, দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের পদত্যাগ নিয়ে ছড়িয়ে পড়া এসব সংবাদ ভিত্তিহীন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইতিহাস গড়লেন যে ১০ প্রার্থী। এ পরাজয়ের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা।
হেগসেথের ওপর চাপ ও অভিশংসনের হুমকি
মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় হেগসেথের ভূমিকা নিয়ে প্রবল সমালোচনা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবির জন্য এই যুদ্ধকে অন্যতম দায়ী করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে তাঁকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি উঠেছে। এর মধ্যে রিপাবলিকান প্রতিনিধি টমাস ম্যাসি ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী সপ্তাহের শুরুতেই তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপন করবেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ম্যাসি লিখেছেন, জানুয়ারিতে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ট্রাম্পের উচিত হেগসেথকে সরিয়ে দেওয়া। আট মাস আগে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধে দিকনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই দুজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ম্যাসি লিখেছেন, ‘সিনেটে উত্তরসূরিদের নিয়োগ নিশ্চিত করার সুযোগ থাকা অবস্থাতেই তাঁর (ট্রাম্পের) এটি করা উচিত।’। একই সঙ্গে তাঁর নেতৃত্বে প্রতিরক্ষা বিভাগ কীভাবে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়ন করেছে, তার বিবরণ দিয়েছেন।
হেগসেথের আত্মপক্ষ সমর্থন
এর জবাবে এক ভিডিও বিবৃতিতে হেগসেথ নিজের ভূমিকার পক্ষে জোরালো কথা বলেছেন। একই সঙ্গে অভিশংসনের উদ্যোগের নিন্দা জানিয়েছেন তিনি। হেগসেথ বলেন, ‘দেখুন, তারা আমাকে আক্রমণ করছে। তারা আমাদের আক্রমণ করছে কারণ আমরা কার্যকর। এতে কোনো কাজ হবে না। আমরা পিছু হটব না।’ তিনি এই অভিশংসনের উদ্যোগকে ‘ভুয়া অভিশংসন প্রস্তাব’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি দাবি করেন, এই উদ্যোগের পেছনে একজন অসন্তুষ্ট, পরাজিত কংগ্রেস সদস্য ও তাঁর ডেমোক্র্যাট মিত্ররা রয়েছেন। তিনি ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা করে বলেন, তাদের নীতি কাজ করে না বলেই তারা রাজনৈতিক নাটক মঞ্চস্থ করছে। তাই ক্ষমতার প্রদর্শনীর আড়ালে রাজনৈতিক নাটক মঞ্চস্থ করার প্রতি তাদের আসক্তি প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার চেষ্টায় ঠেলে দেয়।
সাফল্যের দাবি ও ট্রাম্পের অবস্থান
বিবৃতিতে নিজের কাজের সাফল্যের কথা তুলে ধরেন হেগসেথ।
তিনি দাবি করেন, তাঁর নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ বেড়েছে, প্রতিরক্ষাশিল্পের ভিত্তি পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং সেনাবাহিনী থেকে বৈচিত্র্যবিষয়ক বিতর্কিত উদ্যোগগুলো বন্ধ করা হয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন হেগসেথকে নিয়ে আসা এসব অভিযোগ ও অভিশংসনের গুঞ্জন নাকচ করেছে। বিনা রক্তপাতে যুক্তরাষ্ট্রে ‘রেজিম চেঞ্জ’।
ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, পিট হেগসেথ অসাধারণ কাজ করেছেন এবং তাঁকে দায়িত্বে রাখার পূর্ণ ইচ্ছা তাঁর আছে। ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরান যুদ্ধের প্রসঙ্গটি সামনে আনলেও হেগসেথের দক্ষতার পক্ষে কথা বলেছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওর ভবিষ্যৎ
অন্যদিকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পদ ছাড়তে পারেন—এমন খবরও অস্বীকার করা হয়েছে। হোয়াইট হাউস ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর উভয়ই এসব খবরকে ‘ভুয়া খবর’ বলে অভিহিত করেছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রুবিও স্পষ্ট করেছেন যে, ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে কাজ করাই তাঁর পরিকল্পনা ছিল। রুবিও বিদ্রূপ করে বলেন, ‘আমি যে কাজ করছি তা ভালোবাসি। আর তাঁরা যখন বলেন আমি চাকরি ছেড়ে চলে যাচ্ছি, তখন আমি হাসি। আমি বলি, কোন চাকরিটা?’
প্রশাসনে রদবদলের সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট
- নির্বাচনী পরাজয়ের পর ট্রাম্প প্রশাসনে নড়চড় শুরু হয়েছে।
- ট্রাম্প জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন কিংবা সেন্টকমের প্রধান ব্র্যাড কুপারকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বিবেচনা করছেন।
- ইরান যুদ্ধের নবম মাস চলছে, যা প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ বাড়িয়ে দিয়েছে।
- হেগসেথ টেনেসি অঙ্গরাজ্যের একটি শূন্য সিনেট আসনে নির্বাচন করতে পারেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে।
- প্রশাসনিক রদবদলের বিষয়টি এখন হোয়াইট হাউসের অন্যতম প্রধান আলোচিত বিষয়।
ট্রাম্পের দলের এই ঐতিহাসিক ভরাডুবির নেপথ্যে বিভিন্ন কৌশলগত ব্যর্থতার সমালোচনা চলছে। সব মিলিয়ে হোয়াইট হাউস এখন এই সংকট মোকাবিলা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছে।
সূত্র: প্রথম আলো








