পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার দণ্ডপাল ইউনিয়নের শান্তিনগর এলাকায় রুবিনা খাতুনের বাড়িতে ঢুকলেই চোখে পড়ে এক অগোছালো জীবন। বিছানার পাশে একটি হুইলচেয়ার, আর তার পাশেই রান্নার সরঞ্জাম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। বিছানায় বই নিয়ে বসে থাকা রুবিনার জীবন এখন হুইলচেয়ার আর অনিশ্চয়তার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ। আট বছর আগে এক মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনায় দুই পা হারানো রুবিনা স্নাতক শেষ করলেও এখনো পাননি কোনো চাকরি। গত ২১ জুন তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সরকারি-বেসরকারি নানা আশ্বাস মিললেও বাস্তবে তাঁর ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
ঘটনাটি ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারির। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী রুবিনা অসুস্থ শরীর নিয়ে ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। কমলাপুর রেলস্টেশনের ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার পথে হঠাৎ মাথা ঘুরে তিনি রেললাইনে পড়ে যান। ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রেনের ইঞ্জিন ঘোরানোর সময় ইঞ্জিনের নিচে কাটা পড়ে তাঁর দুই পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। রেলওয়ে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। রুবিনা জানান, হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই তিনি অনার্সের শেষ পরীক্ষা দিয়েছিলেন এবং পাসও করেছিলেন। তবে এরপর আর স্নাতকোত্তর পড়া সম্ভব হয়নি।
রুবিনার শিক্ষাজীবন ছিল মেধাদীপ্ত। এসএসসি ও এইচএসসি—উভয় পরীক্ষাতেই তিনি জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অল্প সময়ের মধ্যেই দিনমজুর বাবা রবিউল ইসলাম মারা যান। এরপর মা রহিমা খাতুনের চেষ্টায় এবং শিক্ষাবৃত্তি ও টিউশনির টাকায় পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু দুর্ঘটনার পর জীবন পুরোপুরি থমকে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর বাড়ি ফিরে তিনি অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। সরকারি ও বেসরকারি সহায়তায় একটি গরুর খামার গড়ে তুলেছিলেন তাঁরা, যা মা ও ছোট ভাই রুবেল হকের চেষ্টায় একসময় ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল।
২০২২ সালের ৩ মার্চ দিনাজপুরের পার্বতীপুরের জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে রুবিনার বিয়ে হয়। রুবিনার শারীরিক অবস্থার কথা জেনেই জাহাঙ্গীর সংসার করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। রুবিনার অভিযোগ, বিয়ের পর স্বামী খামারের গরু বিক্রি করে প্রায় ১১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন এবং তাঁর ওপর দুর্ব্যবহার শুরু করেন। এর মধ্যে মা রহিমা খাতুন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। অবশেষে ২০২৪ সালের ১ জুন নির্যাতনের অভিযোগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পরিবারের সহায়তায় রুবিনাকে স্বামীর বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় এবং পরে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।
রুবিনা আক্ষেপ করে বলেন, ভেবেছিলাম পাশে দাঁড়ানোর মতো একজন মানুষ পেয়েছি, কিন্তু সেখানেও প্রতারিত হতে হয়েছে। এই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মা রহিমা খাতুন মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর থেকে বাবার রেখে যাওয়া ৫৩ শতক আবাদি জমিতে চাষাবাদ করে কোনোমতে সংসার চলছে। আট শতকের ভিটেমাটিতে তিন ভাইবোন বসবাস করছেন। বড় বোন জুলেখা খাতুন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় সংসারের পুরো দায়িত্ব এখন ছোট ভাই রুবেল হকের কাঁধে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করা রুবেল হকও চাকরির সন্ধানে আছেন। তিনি জানান, মায়ের মৃত্যুর পর বড় বোন ও দুই পা হারানো মেজ বোনের দায়িত্ব পালন করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। নিজের চাকরির চেষ্টার পাশাপাশি বাড়িতে দুই বোনের দেখাশোনা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। তাঁদের প্রত্যাশা, অন্তত একজনের কর্মসংস্থান হলে পরিবারের বেঁচে থাকার পথ সহজ হতো।
চাকরির বয়সসীমা প্রায় শেষের দিকে, তবুও রুবিনা এখনো বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। তিনি বলেন, খুব কষ্টে দিন কাটছে, কিন্তু এখনো একটি চাকরির আশায় পরীক্ষা দিচ্ছি। সময় ফুরিয়ে আসছে, অথচ পরিবারের খোঁজ নেওয়ার মতো আর কেউ নেই। একসময় মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখা রুবিনার এখন একমাত্র অবলম্বন একটি চাকরি, যা তাঁর পরিবারের ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন পথ দেখাতে পারে।
বাড়ির উঠান পেরিয়ে ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ে অগোছালো সংসার।
অন্য পাশে রাখা চুলা, হাঁড়িপাতিল আর নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস।
ছোটবেলা থেকেই সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী।
শিক্ষাবৃত্তির টাকা, টিউশনি আর মায়ের গরু–ছাগল, হাঁস–মুরগি পালনের টাকা দিয়ে পড়াশোনার খরচ চালাতেন রুবিনা।
ঠিক তখনই ওই দুর্ঘটনা বদলে দেয় সব হিসাব।
মনে হয়েছিল, হয়তো জীবন আবার একটু স্বাভাবিক হবে।
কিন্তু নতুন করে বাঁচার সেই স্বপ্নও বেশি দিন টেকেনি।
আমাদের দুই ভাই–বোনের একজনেরও যদি একটা কর্মসংস্থান হয়, তাহলে অন্তত খেয়েপরে বাঁচতে পারব।’
সূত্র: প্রথম আলো







