ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্র সংসদ: কোনটি আসলে প্রয়োজন?

প্রকাশ:

বাংলাদেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে সক্রিয় অধিকাংশ ছাত্রসংগঠনই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগত। এসব সংগঠন শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করার পরিবর্তে প্রায়শই দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকে, যা উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পরেও ক্যাম্পাসে পারস্পরিক সহনশীলতার বদলে সংঘাতের ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে, যা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আশির দশকে এরশাদ সরকারের আমলে দলীয় ছাত্রসংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে আধিপত্য বজায় রাখতে দেশীয় অস্ত্র, লাঠিসোঁটা, এমনকি পিস্তল ও শটগান ব্যবহারের মতো সহিংসতায় লিপ্ত হয়েছিল। ওই সময়ে আবাসিক হলগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর ছত্রচ্ছায়ায় থাকা সংগঠনগুলোও প্রায় একইভাবে ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। বিশেষ করে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও আবাসিক হল দখলসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া এসব সংগঠন সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের মতো একাডেমিক গুরুত্বপূর্ণ কাজেও ছাত্রনেতাদের হস্তক্ষেপ দেখা যায়। রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন থাকায় অনেক সময় নিয়মবহির্ভূত কাজের পরও তারা এক ধরনের দায়মুক্তির সুযোগ পেয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক-রাজনীতির সাথে ছাত্ররাজনীতির যোগসাজশ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও অসহায় করে তোলে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বারবার নিপীড়নের প্রতিবাদ করলেও এর কোনো চূড়ান্ত প্রতিকার পাননি, কারণ জাতীয় রাজনীতির উচ্চপর্যায় থেকেই দলীয় ছাত্ররাজনীতিকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা ফেরাতে দলীয় ছাত্রসংগঠনের পরিবর্তে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিত করার কোনো বিকল্প নেই। ছাত্র সংসদ সচল থাকলে শিক্ষার্থীদের অধিকার ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমের গতি বাড়বে। যখন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি থাকে না, তখন ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিরা সম্মিলিতভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করতে পারেন। বর্তমানের সংঘাতময় পরিস্থিতির দায়ভার অনেকাংশে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরই বর্তায়, যারা নিজেদের ক্ষমতা সুসংহত করার উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীদের দলীয় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ও সুস্থ ধারার রাজনীতির স্বার্থে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ দলীয় রাজনীতির বাইরে রাখা উচিত। শিক্ষাজীবন শেষে শিক্ষার্থীরা যেকোনো দলের সদস্য হতে পারেন, তবে ছাত্রাবস্থায় তাদের দলীয় রাজনীতির বৃত্ত থেকে বের করে আনা প্রয়োজন। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সদস্যপদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম বয়সসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দেশে ছাত্রদের জন্য বাধ্যতামূলক বা স্বতঃপ্রণোদিত বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে, যা জাতীয় দুর্যোগ বা প্রয়োজনে কাজে লাগে। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও ঐতিহাসিকভাবে তাদের সম্মিলিত মতপ্রকাশের সক্ষমতা দেখিয়ে আসছেন। তাই ছাত্ররাজনীতি মানেই যে ছাত্রসংগঠনভিত্তিক সহিংসতা হতে হবে—এই ধারণার পরিবর্তন জরুরি। ছাত্র সংসদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রাজনীতিই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভেদ ও প্রতিহিংসা কমিয়ে শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুরের মতে, ছাত্ররাজনীতি আর দলীয় লেজুড়বৃত্তির সংগঠনভিত্তিক রাজনীতি কখনোই এক বিষয় নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু এসব ছাত্রসংগঠনের রাজনীতি ও কর্মসূচি খুব কম ক্ষেত্রেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথা বলে; বাস্তবে তাদের কর্মকাণ্ড উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশকেই নষ্ট করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তত পারস্পরিক সহনশীলতা আশা করা গিয়েছিল; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়েও সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তখনকার সেশনজটের পেছনে ছাত্রসংগঠনগুলোর সংঘাতই দায়ী। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অতীতের ধারাবাহিকতায় বর্তমানেও ছাত্ররাজনীতি মানে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা আর নিজেদের মধ্যে মারামারি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত কয়েক দশকে ছাত্রসংগঠনগুলো চাঁদাবাজি, টেন্ডার দখল থেকে শুরু করে আবাসিক হল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিভিন্ন আপত্তিকর ও নীতিবিরুদ্ধ কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংগঠনগুলো সাধারণ শিক্ষার্থীদের যেমন নিপীড়ন করে, তেমনি অন্যায় কাজে তাদের ব্যবহারও করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যাঁরা ছাত্ররাজনীতির পক্ষে কথা বলেন, তাঁরা নিশ্চয় ছাত্রসংগঠনগুলোর এ রকম সহিংস আচরণ ও শক্তি প্রদর্শনের কথা বলেন না।

শেয়ার করুন