রাজধানী ঢাকায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে চাঁদাবাজির দাপট। ফুটপাথ থেকে শুরু করে কাঁচাবাজার, বহুতল ভবন, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন কলকারখানায় চলছে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা প্রাণনাশের ভয়ে মুখ খোলেন না কিংবা থানায় অভিযোগ করতে ভয় পান। নীরবে চাঁদা দেওয়ার সংস্কৃতিতে এই অপরাধ আরও জেঁকে বসছে। তবে যারা সাহস করে মামলা করছেন, তাদের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার হারও অনেক বেশি। সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন থানায় দায়ের করা চাঁদাবাজির মামলার প্রায় ৮৫ শতাংশ অভিযোগই তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে এবং এসব মামলায় পুলিশ আদালতে চার্জশিটও জমা দিয়েছে। নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ২০ মাসে মহানগরে চাঁদাবাজির ৩৬৫টি মামলায় চার্জশিট দেয়া হয়েছে। আর ১৫ শতাংশ মামলায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। ফুটপাথ থেকে শুরু করে হাসপাতাল, বাড়ির মালিক, মুদির দোকান, হাসপাতাল, কলকারখানা, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, শপিংমল থেকে চাঁদা তুলছে চাঁদাবাজরা।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র আট মাসে ঢাকা মহানগরীর ৫০টি থানার মধ্যে ৪৯টিতেই ৭২৩টি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে মোহাম্মদপুর থানা এলাকা থেকে। এরপরই রয়েছে যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা থানা। এখন পর্যন্ত ৭২৩টি মামলার মধ্যে ৪২৫টির তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ, বাকি মামলাগুলো এখনো তদন্তাধীন। মামলা দায়েরের হার বাড়লেও দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতে বছরের পর বছর পেরিয়ে যাচ্ছে, যা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। তদন্তাধীন রয়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ মামলা।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং গোয়েন্দা ইউনিটগুলোর সমন্বিত এক তালিকায় দেখা গেছে, রাজধানীতে সক্রিয় চাঁদাবাজের সংখ্যা ১ হাজার ২৮০ জন। এই তালিকার সবচেয়ে ভয়ংকর অংশ হলো অস্ত্রধারী চাঁদাবাজ, যাদের সংখ্যা ১৪৮ জন। অস্ত্র ব্যবহার করে যারা ভীতি প্রদর্শন করছে, তাদের তালিকায় শামীম, জাকির হোসেন, আবুল বাশার বাদশা, কায়সার ওরফে গলাকাটা কায়সার, মহারাজ মিয়া, শফিকুল ইসলাম হেলাল, তানভীর, আরিফ হোসেন রিপন, আবু সাঈদ রাসেল, কাওসার মোল্লা ওরফে কানা কাওসার, সায়মন, বরিশাইল্যা শান্ত, নাহিদ, মামুন, রাব্বী, মিনহাজ, আরিফ ওরফে পিস্তল আরিফ এবং শুভ ওরফে ঘাতক শুভ’র মতো ব্যক্তিদের নাম রয়েছে। এদিকে, ঢাকা মহানগর পুলিশের এক পরিসংখ্যানে ঢাকায় প্রায় ১২৮০ জন চিহ্নিত চাঁদাবাজদের নাম উঠে এসেছে।
তালিকায় আরও উঠে এসেছে, সুব্রত বাইন গ্রুপের অস্ত্রধারীদের মধ্যে রয়েছে মাহফুজুর রহমান ওরফে বিপু, আরাফাত ইব্নে নাসির, শরীফ ও মধু। তবে স্থানীয়দের মতে, সুব্রত বাইনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীর নাম এখনো তালিকার বাইরে রয়ে গেছে। এর বাইরে চকবাজার এলাকায় মো. সালাউদ্দিন ওরফে বিয়ার সালাউদ্দিন ও হাসান সারোয়ার পিলু; সবুজবাগে রিফাতুল্লাহ নাঈম, হৃদয় সরকার, মো. সাঈদ, শফিকুল ইসলাম ও নুরুন্নবী বাবু এবং খিলগাঁও এলাকায় মকবুল হোসেন, মিন্টু ওরফে কিলার মিন্টু, আলিফ ও শুভ ওরফে রিপনের মতো ব্যক্তিরা সক্রিয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চাঁদাবাজিতে এখন কিশোর গ্যাং সদস্যদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কৌশলী চাঁদাবাজরা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের দিয়ে অপরাধ করাচ্ছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, শুধুমাত্র তালিকা তৈরি বা মাঝেমধ্যে কিছু গ্রেপ্তারই চাঁদাবাজি বন্ধের জন্য যথেষ্ট নয়। যদি সব অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনা না হয়, তবে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে না পারলে চাঁদাবাজির এই দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
পুলিশ ও গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা সিন্ডিকেট গড়ে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে থানা-পুলিশের অগোচরেই এসব ঘটনা ঘটছে। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের কারণে ভুক্তভোগীরা অসহায় হয়ে পড়েন। যদিও পুলিশের কাছে চাঁদাবাজ ও তাদের আশ্রয়দাতাদের তালিকা রয়েছে, তবুও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুধু তালিকাভুক্তদের গ্রেপ্তারই নয়, তাদের পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ততদিনে অনেক আসামি জামিনে বের হয়ে যান। তাই এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: মানবজমিন








