মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা: বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

প্রকাশ:

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনায় সৌদি আরবসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ঢাকা থেকে রিয়াদসহ বিভিন্ন গন্তব্যের ৮২টিরও বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার নতুন ও পুরনো কর্মী দেশটিতে যেতে না পেরে ঢাকায় আটকা পড়ে চরম দুর্ভোগ ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। এছাড়া সাম্প্রতিক হামলায় বিমানবন্দরে বাংলাদেশি কর্মী হতাহতের ঘটনায় প্রবাসী ও নতুন করে গমনেচ্ছুদের মধ্যে মারাত্মক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সৌদি আরব বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির বৃহত্তম গন্তব্য ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস হওয়ায়, এই অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজার বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। রেমিট্যান্সে সৌদির বড় অবদান বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি শ্রমিক থাকেন সৌদি আরব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে প্রায় ৫৮৪ কোটি ৯১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের ৪২৬ কোটি ৪৪ লাখ ডলারের তুলনায় প্রায় ৩৭ শতাংশ বেশি। সেই অর্থবছরে মোট ৩ হাজার ৫৫৯ কোটি ডলার রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশ এসেছে সৌদি আরব থেকে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়েও দেশটি থেকে ১৬৫ কোটি ডলার এসেছে, যা মোট রেমিট্যান্সের ১৯.২ শতাংশ। একইসাথে তৃতীয় অবস্থানে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এই সময়ে এসেছে ৭৭ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। এই শ্রমবাজারে যেকোনো বিঘ্ন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। সৌদি প্রবাসী ব্যবসায়ী শহীদুল জানান, যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব তার ব্যবসায় পড়েছে; পর্যটকশূন্যতা ও অস্থিরতায় রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখতে হওয়ায় তার আয় তলানিতে ঠেকেছে এবং দেশে টাকা পাঠানো প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ এই অঙ্ক ছিল ৪২৬ কোটি ৪৪ লাখ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে দেশটি থেকে এসেছে প্রায় ১৬৫ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৪ শতাংশ বেশি।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে রেকর্ড ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন কর্মী সৌদি আরবে গেছেন, যেখানে মোট ১১ লাখ কর্মীর দুই-তৃতীয়াংশই দেশটিতে পাড়ি জমিয়েছেন। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি রয়েছেন। তবে ২০২৬ সালের ১লা মার্চ থেকে ১০ই অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবে জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে ২ লাখ ১ হাজার ৩৬১ জন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৫ শতাংশ কম। সব মিলিয়ে চলতি বছরের ১০ই অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৫৯৭ জনের, যা গত বছরের তুলনায় ৩২ শতাংশ কম। এছাড়া কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, জর্ডান ও ইরাকেও কর্মী পাঠানোর হার সংকুচিত হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কর্মীকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে। সরকার এখন পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বের অন্যান্য দেশে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছে। একই বছরে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বাংলাদেশ ছেড়েছেন ১১ লাখের বেশি মানুষ, তাদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি গেছেন সৌদি আরবে। এ ছাড়া কাতারে ৪২ হাজার ৫১৬ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০ হাজার ৬৬১ জন এবং কুয়েতে ২০ হাজার ২৫৪ জন কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গেছেন। একই সময়ে জর্ডানে ১০ হাজার ১০ জন এবং ইরাকে ২ হাজার ৮৭৮ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই সরকার একটি জটিল বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। বর্তমানে প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নতুন করে কর্মী পাঠানোর বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও চলমান সংঘাতের কারণে প্রবাসীদের চাকরি হারানো ও দেশে ফিরে আসার আশঙ্কায় রেমিট্যান্স প্রবাহে তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফরমের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, দীর্ঘদিনের সৌদি-নির্ভরতার ফলে এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। একদিকে কর্মসংস্থান কমেছে, অন্যদিকে প্রবাসী কর্মীরা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছেন। তিনি বলেন, এটি গ্রামীণ অর্থনীতি ও প্রবাসীদের পরিবারের জীবনযাত্রার ওপরও দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দেশের অর্থনীতির স্বার্থে সৌদি আরবের সাথে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের আলোচনা এবং ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। দেশে পরিবারকে টাকাও পাঠাতে পারছেন না তিনি।

শেয়ার করুন