দরিদ্র পরিবারের অদম্য মেধাবী মেয়ে, যারা নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের স্বপ্ন পূরণে আইডিএলসি ও ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে দেওয়া হয় ‘অদ্বিতীয়া’ বৃত্তি। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) ছাত্রীদের জন্য নির্ধারিত এই বৃত্তির আওতায় আবাসন ও টিউশন ফি মওকুফসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। ২০১২ সাল থেকে ট্রান্সকম গ্রুপের সহযোগিতায় ৪২ জন এবং ২০১৭ সাল থেকে আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসির সহায়তায় ১০১ জন—সর্বমোট ১৪৩ জন শিক্ষার্থী এই বৃত্তি অর্জন করেছেন। ইতিমধ্যে ৮৬ জনের স্নাতক সম্পন্ন হয়েছে, যাদের অনেকেই বর্তমানে দেশে ও বিদেশে সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। এ বছর নতুন করে বৃত্তি পেয়েছেন ১৫ জন শিক্ষার্থী। ৮৬ জনের এরই মধ্যে স্নাতক শেষ হয়েছে। তাঁর এই কষ্ট, তাঁর স্বপ্ন ছোটবেলা থেকে আমাকেও প্রভাবিত করেছে।
এই বৃত্তিপদক প্রাপ্তদের মধ্যে পাঁচজনের সংগ্রামের গল্প যেমন অনুপ্রেরণাদায়ী, তেমনি হৃদয়স্পর্শী। শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানের শ্রমিকের সন্তান, যিনি প্রতিদিন মাত্র ১৮৭ টাকা মজুরিতে চলা বাবার অভাবের সংসারে বড় হয়েছেন। গাইড বই কেনার সাধ্য না থাকায় বন্ধুদের বই ধার করে এবং স্মার্টফোন না থাকায় পিসতুতো ভাইয়ের ফোনে ইউটিউব দেখে পড়ালেখা চালিয়েছেন তিনি। অদম্য এই শিক্ষার্থী ২০২২ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি এবং ২০২৪ সালে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করেন। দুই বোনের পড়াশোনার খরচ চালাতে গিয়ে বাবার ওপর যে বাড়তি চাপ পড়ছে, অদ্বিতীয়া বৃত্তি তাকে সেই আর্থিক দুশ্চিন্তা থেকে কিছুটা মুক্তি দিয়েছে। শ্রীমঙ্গলের কালীঘাট চা-বাগানের একটি ছোট্ট ঘরে আমার জন্ম। সংসারে অভাব থাকলেও বাবা সব সময় স্বপ্ন দেখেছেন, আমি পড়ালেখা করব, বড় হব। একাদশ শ্রেণিতে ওঠার পর কোচিং করার সামর্থ্য ছিল না। পড়ুন তাঁদের মধ্যে ৫ জনের গল্প। ছোট দুই বোনের একজন অষ্টম শ্রেণিতে, অন্যজন প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। তবে মা-বাবার ইচ্ছা ছিল, তাঁরা উচ্চশিক্ষা না পেলেও সন্তানদের শিক্ষিত করবেন। কখনো মাসে সাত হাজার টাকা আয় হতো, কখনো তার অর্ধেকেরও কম। আমার মতো যাঁরা আর্থিক সংকটে দিন কাটান, ভবিষ্যতে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে চাই।
আরেক মেধাবী শিক্ষার্থীর সংগ্রামের গল্পটিও একই রকম কঠিন। কৃষক বাবা ও চা-শ্রমিক মায়ের সাতজনের সংসার চলে অনিশ্চিত আয়ে। ২০২৩ সালে এসএসসিতে এবং ২০২৫ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলেও তার পেছনে লুকিয়ে আছে অমানবিক শ্রম ও সংগ্রাম। চট্টগ্রাম শহরে পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া এই শিক্ষার্থী আশা করছেন, বৃত্তির সহায়তা তাকে সামনের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
জুমচাষি পরিবারের আরেক অদম্য শিক্ষার্থীর শৈশব কেটেছে ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে। এমন দিনও গেছে, ক্ষুধা পেটে রাত কাটিয়েছি।
স্কুলের পোশাক কেনার টাকা জোগাতে অন্যের জমিতে কাজ করতে হয়েছে তাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ঋণের দায় শোধ করতে ঢাকায় এসে চাকরির খোঁজ করেন এবং সেখানেই এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বৃত্তির খবর জানতে পারেন।
বর্তমানে তিনি প্রি-আন্ডারগ্র্যাড পাথওয়ে কোর্সে পড়ছেন। একই পরিস্থিতিতে পড়া আরেক শিক্ষার্থীর বাবা ২০২৩ সালে কিডনি রোগে মারা গেছেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবাকে হারিয়ে গৃহিণী মায়ের সংসার ও ভাইয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব এখন তার কাঁধে। পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ কমাতে তিনি নিজেই নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর চেষ্টা করেছিলেন, যা এখন বৃত্তির মাধ্যমে কিছুটা সহজ হয়েছে। এখন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে পড়ছি; কিন্তু যাতায়াত, বই-খাতা ও পড়াশোনার অন্যান্য খরচ চালানো পরিবারের জন্য খুব কঠিন।
আরেকজন শিক্ষার্থীর জীবনের গল্পে আছে মা-বাবার বিচ্ছেদের বেদনার ছাপ। মায়ের একার লড়াই ও অনেক ত্যাগ সহ্য করেই তারা তিন ভাই-বোন বড় হয়েছেন। নিজেদের কোনো বাড়ি নেই বলে দীর্ঘদিন মামার বাড়িতে থাকতে হয়েছে। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে মেজ ভাই পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নেমে বোনদের পড়াশোনায় সহায়তা করেছেন। ২০২৪ সালে এইচএসসি পাসের পর প্রথমবার এশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে সুযোগ না পেলেও দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তিসহ পড়ার সুযোগ পান তিনি। এই মেধাবীরা প্রত্যেকেই নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার স্বপ্ন দেখেন। কারণ, পরিবারের আয়ের নির্ভরযোগ্য কোনো উৎস নেই। এরপর মা একাই আমাদের তিন ভাই–বোনকে বড় করেছেন। নিজের জন্য কোনো দিন একটা নতুন জামাও কিনতে পারেননি।
সূত্র: প্রথম আলো








