রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতি হামলা

প্রকাশ:

সৌদি আরবের অভ্যন্তরে এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনায় দেশটি এখন বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, তাতে অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। রবিবার দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। নিহতদের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিকও রয়েছেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রিয়াদের নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। রিয়াদ এক দশকের বেশি সময় ধরে গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে লড়াই করছে, এর জেরে ইয়েমেনে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল। দেশটির প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা প্রায় এক দশকের গৃহযুদ্ধের পর ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে সিরিয়া থেকে বিতাড়িত করতে সফল হওয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

দীর্ঘ ১১ বছর ধরে সৌদি আরব সামরিক অভিযান এবং আলোচনার মাধ্যমে হুতিদের দমানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু হুতিরা তাদের যুদ্ধের কৌশলে অভাবনীয় পরিবর্তন এনেছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অভিযোগ, হুতিরা ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে অত্যন্ত কার্যকর ও শক্তিশালী অস্ত্রে রূপান্তর করেছে। ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আল-নাজিলি দাবি করেছেন, তাদের নতুন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অনেক দ্রুতগামী এবং তাপ অনুসরণকারী প্রযুক্তিতে সজ্জিত। তবে সম্প্রতি সৌদি আরবে আবার হুতিদের হামলা বেড়ে যাওয়ার ঘটনাকে শুধু আগের শত্রুতার জেরে নয়, বরং ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের সম্প্রসারণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হুতিরা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহারেও দক্ষ হয়ে উঠছে। এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, উত্তর ইয়েমেনে সক্রিয় একটি গোষ্ঠী রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের গাইডেন্স সফটওয়্যার তৈরিতে তাদের ‘ক্লড’ এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করেছে। এর ফলে অস্ত্রের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীল রাখা সহজতর হয়েছে, যা বিদ্রোহীদের হামলার সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে তারা হুতিদের নিয়ন্ত্রিত উত্তর ইয়েমেনে অবস্থান করায় বিদ্রোহীদের সঙ্গে তাদের সম্ভাব্য যোগসূত্র থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

সৌদি রাজনীতির বিশ্লেষক আলী শিহাবি সিএনএনকে বলেন, এই হুমকি একেবারে চিরতরে নির্মূল করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, রণক্ষেত্রে সৌদি–সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর দক্ষতার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। সৌদি আরব বিমান হামলার মাধ্যমে তাদের সহায়তা দিলেও স্থলভাগে বড় কোনো অভিযান থেকে এখন পর্যন্ত বিরত থেকেছে। তবে রিয়াদের বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালেদ বিন সালমানের সামনে বিকল্প পথ খুব সীমিত হয়ে পড়েছে। তুরস্কের মতো অন্য মিত্রদেশগুলোও সহায়তা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সৌদি আরব যদি এখন ইয়েমেনে সরাসরি স্থলবাহিনী মোতায়েন করে, তবে দেশটি একটি ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ফাঁদে আটকে পড়বে। এতে সৌদি আরবের আধুনিকায়ন ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার যে পরিকল্পনা যুবরাজ হাতে নিয়েছেন, তা বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। তবে সীমান্তে হুতিদের ক্রমবর্ধিষ্ণু শক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ক্রমাগত হামলা বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকি তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

সৌদি আরব এই সংকট মোকাবিলায় ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তানের মতো মিত্রদের সমর্থন চেয়েছে। এমনকি সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকেও সহায়তার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সরাসরি বিমান হামলায় অংশ নেওয়ার বদলে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের জন্য ১০০ জনের বেশি সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছে। যদিও গত মাসে সৌদি যুবরাজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আলাপকালে হুতিদের ওপর হামলার অনুরোধ করেছিলেন বলে জানা গেছে।

রিয়াদে শনিবারের হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদিদের ‘ভালো যোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করলেও, সরাসরি কোনো সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলেননি। তবে হুতিদের ওপর হামলায় যুক্তরাষ্ট্র যোগ দেবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানিয়েছেন, সেটি হতে পারে। সৌদি আরবের মতো আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও হুতিদের তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখা দেশটির জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোষ্ঠীটি ইয়েমেনের বড় কয়েকটি শহরের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করেছে এবং জনবহুল তাইজের মতো আরও কিছু শহর দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে।

মূলত ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই সংঘাতকে দেখা হচ্ছে। আগে বাব আল-মানদেব প্রণালিতে সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ নিরাপদ রাখতে যুদ্ধবিরতি হলেও এখন হুতিরা পুনরায় আক্রমণাত্মক অবস্থানে ফিরেছে। সব মিলিয়ে, এই ভয়াবহ হামলার প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরব এখন কোন কৌশল অবলম্বন করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। মাত্র দুই দশক আগেও হুতিরা মূলত ছোট একটি ধর্মভিত্তিক আন্দোলন ছিল।

শেয়ার করুন