বিমানবাহিনীর বরখাস্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরীর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন রহস্যের জাল বুনেছে তদন্তকারী দল। পুলিশের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, নিখোঁজের আগের রাতে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’-এ এক তরুণীর সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন তাহসিফ। বর্তমানে সেই রহস্যময়ী তরুণীর পরিচয় শনাক্ত করতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন তদন্তকারীরা। তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে উত্তরার সোনারগাঁও জনপথ রোডের ১৩ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’-এ তাকে ওই তরুণীর সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। ওই তরুণীর বয়স ২৪-২৫ বছর।
শুক্রবার রাতে তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রেক্ষিতে তাহসিফের জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে নৌপুলিশ। রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় দীপ ফোন করে তাহসিফকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যান। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরদিন তুরাগ নদে তার মরদেহ ভেসে ওঠে। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপের ডাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি লাশ ভাসার খবর পায় পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দীপের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পুলিশ দেখে ভয়ে তারা আলাদা হয়ে যান এবং তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। তবে এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে ডিইপি, পুলিশ ও গোয়েন্দারা বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছেন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে তাহসিফ ও ওই তরুণী মোটরসাইকেলে করে রেস্টুরেন্টে পৌঁছান। সেখানে তারা প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থান করেন। তরুণীটি গেঞ্জি, প্যান্ট ও কেডস পরিহিত ছিলেন এবং তার হাতে একটি সাদা পলিথিন ব্যাগ ছিল। পরিবারকে কী ধরনের সহযোগিতা করা যায়, তা জানতে চেয়েছেন তারা।
নৌপুলিশ ঢাকা রেঞ্জের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, মামলার তদন্তে অনেক তথ্যই সামনে আসছে, তবে দীপের দেওয়া বক্তব্যে কিছু অসংগতি পাওয়া যাচ্ছে। তাহসিফকে বাসা থেকে ডেকে নেওয়া থেকে শুরু করে তুরাগ নদের ঘটনা পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি জানান, তাহসিফ সত্যিই পুলিশের ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে, তা নিশ্চিত হতে রিমান্ডের জিজ্ঞাসাবাদ জরুরি। সেগুলো অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
পিবিআইয়ের প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর দীপকে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পিবিআই সদস্যরা ঘটনার স্থান পরিদর্শন করে কিছু আলামত সংগ্রহ করেছেন। এখন তাহসিফের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের ফরেনসিক রিপোর্ট এবং মোটরসাইকেল উদ্ধারের বিষয়টি তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ঘটনাস্থলে তাহসিফের মোটরসাইকেল কীভাবে এলো, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
এদিকে, ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও প্রকৃত রহস্য উন্মোচনের দাবি জানিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘রাওয়া’। শনিবার সংগঠনের নেতারা তাহসিফের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানান এবং তদন্ত প্রক্রিয়ার ওপর নজর রাখার প্রতিশ্রুতি দেন। রাওয়ার যুগ্ম সম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশিদ আলম বলেন, একজন সাবেক কর্মকর্তার এ ধরনের মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং তারা এর নিরপেক্ষ তদন্ত আশা করছেন। ওই মামলায় দীপকে গ্রেফতার দেখিয়ে শনিবার দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। শনিবার দুপুরে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘করবী’ ভবনে তাহসিফের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সংগঠনটির নেতারা। তারা আশা করছেন, দ্রুত প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে থাকা দীপকে এ মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসাবে গ্রেফতার দেখানো হয়।
মেজর (অব.) আল আমিন স্পষ্ট করেছেন যে, তারা এই বিচারপ্রক্রিয়া থেকে সরবেন না। ঘটনার প্রতিটি ধাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে যাতে দোষীরা আইনের আওতায় আসে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা এখন স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও সিসিটিভি ফুটেজের সমন্বয় করে প্রকৃত ঘটনার বয়ান তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
তদন্তকারীদের ধারণা, ওই রহস্যময়ী তরুণীকে পাওয়া গেলে মৃত্যুর আগের মুহূর্তের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে। ওই তরুণী টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন কি না, তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বর্তমানে পুলিশ সেই অজ্ঞাতপরিচয় তরুণীর খোঁজ এবং তাহসিফের শেষ সময়ের প্রতিটি পদক্ষেপের অসংগতি মেলাতে কাজ করছে।
তাহসিফের ট্রাউজারের পকেটে পাওয়া আইফোনের সূত্র ধরেই তার পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। বর্তমানে নৌপুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিনের নেতৃত্বে মামলার তদন্ত চলছে। চার দিনের রিমান্ড শেষে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভব হবে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস শুনানি শেষে দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
সূত্র: যুগান্তর








