ব্যালন ডি’অর জয়ের পাশাপাশি ব্যবসার মাঠেও হ্যারি কেইনের সাফল্য

প্রকাশ:

ফুটবল মাঠে গোল করার যেমন দারুণ দক্ষতা দেখিয়েছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন, তেমনি মাঠের বাইরের আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও তিনি সমান দক্ষ। তার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা, পরিবারের সদস্যদের সমর্থন এবং ব্যবসায়িক অংশীদারদের সুপরিকল্পিত ভূমিকা। ফুটবলে গোল আর ব্যবসায় মুনাফা—উভয় ক্ষেত্রেই তিনি এখন সাফল্যের চূড়ায়। আর মাঠের বাইরে টাকা বানানোর জন্য আছে মাথা।

একসময় টটেনহামে ট্রফিহীনতার অপবাদ নিয়ে কেইনকে শুনতে হতো নানা কটাক্ষ। কিন্তু জার্মানির ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে সব প্রতিযোগিতায় ৭৩ গোল করে তিনি প্রমাণ করেছেন নিজের শ্রেষ্ঠত্ব। সর্বশেষ অর্জন হিসেবে ২৫ বছর পর প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’অর জিতেছেন ৩৩ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার। কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামালকে পেছনে ফেলে মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কারের পাশাপাশি তিনি বর্ষসেরা স্ট্রাইকারের সম্মানও অর্জন করেছেন। সর্বশেষ সংযোজন ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর। একসময় তাঁকে নিয়ে একটা রসিকতা চালু ছিল। টটেনহামে থাকতে এই অপবাদ কিছুতেই ঘোচাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত উত্তর লন্ডনের মায়া ছেড়ে চলে গেলেন জার্মানির মিউনিখে। তারপর যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে গেলেন।

ব্যবসায়িক সাফল্যের শুরুটা হয়েছিল অনেক আগে, ২০১৪ সালের অক্টোবরে। মাত্র ২১ বছর বয়সে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন এইচকে২৮ লিমিটেড। বর্তমানে ‘দ্য হ্যারি কেইন কোম্পানি’ নামে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি তার ফুটবল ক্যারিয়ার, বাণিজ্যিক চুক্তি, বিনোদন এবং দাতব্য কাজের পুরো ব্যবস্থাপনা করে। অন্য অনেক খেলোয়াড় যখন বাণিজ্যিক এজেন্সির ওপর নির্ভরশীল, কেইন তখন নিজের প্রতিষ্ঠান দিয়ে পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখেছেন।

আবাসন খাতের ব্যবসায়ও কেইন দারুণ সফল। বাবা, মা ও ভাই চার্লির সঙ্গে তিনি ‘এডওয়ার্ড জেমস ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড’ নামের একটি রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে তাদের প্রতিষ্ঠানের আবাসন সম্পত্তির বাজারমূল্য দেড় কোটি পাউন্ডের বেশি। ব্যবসায়িক ভাই চার্লি শুধু এজেন্ট হিসেবেই নন, বরং কেইনের অর্থ বিনিয়োগের সঠিক দিকনির্দেশক হিসেবেও কাজ করছেন।

ব্যবসার পরিধি শুধু পরিবারের গণ্ডিতে আটকে রাখেননি ইংল্যান্ডের এই তারকা। চেলসির কিংবদন্তি জন টেরির সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে ‘সিট ইউনিক’ নামে একটি টিকিট ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে যুক্ত আছেন তিনি। বিভিন্ন ইভেন্টের টিকিট ব্যবস্থাপনা ও বিক্রির এই প্রতিষ্ঠানের বর্তমান বাজারমূল্য ৫০ কোটি পাউন্ডেরও বেশি। ইংল্যান্ডের হয়ে তিনবার প্রিমিয়ার লিগের গোল্ডেন বুট জেতা কেইন ব্যবসার প্রথম বড় সাফল্য পেয়েছেন আবাসন খাতে।

ব্যবসায়িক বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে কেইন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করছেন। অ্যামাজন, ক্যাডবেরি, টপসসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার বাণিজ্যিক চুক্তি রয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট স্ট্যাটস্পোর্টস ও বায়োঅ্যান্ডমি এবং স্থানীয় বাজারে জার্মান ওটস ব্র্যান্ড থ্রিবিয়ার্সের সঙ্গেও কাজ করছেন তিনি।

বুট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান স্কেচার্সের সঙ্গে তার আজীবনের চুক্তি ফুটবল বিশ্বে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, এই বিশেষ চুক্তি থেকে তিনি বছরে প্রায় ৮০ লাখ পাউন্ড আয় করেন। শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়, মাঠের বাইরের এই বিশাল ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড তাকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বেতনভুক্ত ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে মাঠের পারফরম্যান্সের সুবাদে সপ্তাহে প্রায় ৪ লাখ পাউন্ড বেতন পান তিনি, যার বার্ষিক পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৮ লাখ পাউন্ড। বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বায়ার্ন মিউনিখ তাকে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চাইছে। নতুন কোনো চুক্তি হলে তার আয়ের পরিমাণ আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। বয়স ৩৩ হলেও জার্মান চ্যাম্পিয়নরা নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে চায় ইংল্যান্ড অধিনায়ককে।

ফুটবল ক্যারিয়ার যে সবসময় দীর্ঘস্থায়ী হয় না, তা কেইন খুব ভালো করেই জানতেন। তাই ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলো থেকেই তিনি ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে এগিয়েছেন। বায়ার্নের হয়ে টানা দ্বিতীয় বুন্দেসলিগা শিরোপা ও ঘরোয়া ট্রেবল জয়ের পর, মাঠের বাইরেও অর্থ দিয়ে অর্থ তৈরির এই লক্ষ্য অর্জনই তাকে দুই ভুবনের সফল ‘রাজা’ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে।

শেয়ার করুন