সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ইসলাম ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে সৌদি আরবে ২৪ বছর বয়সি এক শ্রীলঙ্কান প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আনোজান শিবারাসা নামের ওই যুবক বর্তমানে সৌদি কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তার মা রাসামানিক্কাম যোগালক্ষ্মী কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার ছেলেকে ক্ষমা করে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সৌদি সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
শ্রীলঙ্কায় এ ঘটনায় জনমনে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সরকারি সংস্থা ও ধর্মীয় সংগঠনগুলো আনোজানের সাজা মওকুফের জন্য কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। ২১ সেপ্টেম্বর তার পরিবার শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রেসিডেন্ট তাদের আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, আনোজানের জন্য সাধারণ ক্ষমা পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। কবে সাজা কার্যকর হবে, তা-ও জানা যায়নি। তার সাজা কমানোর আবেদন করা হলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হয় বলে জানান শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিতা হেরাথ।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও আইনি প্রক্রিয়া
- জুন মাসে শ্রীলঙ্কায় একটি ধর্মীয় ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনলাইনে বিতর্ক শুরু হয়, যা পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
- বিতর্কের একপর্যায়ে এক ব্যক্তি হিন্দু দেবতাকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করলে, আনোজান তার প্রতিক্রিয়ায় তামিল ভাষায় মহানবী (সা.)-কে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেন।
- পরবর্তীতে তিনি মন্তব্যটি মুছে দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে ভিডিওবার্তা দিলেও, মন্তব্যের স্ক্রিনশট তার নিয়োগদাতার নজরে এলে জুলাই মাসে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
- প্রথমে আল-আহসা ক্রিমিনাল কোর্ট তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ৩০ লাখ সৌদি রিয়াল জরিমানা করলেও, পরবর্তীতে ১৭ সেপ্টেম্বর প্রসিকিউশন আপিল আদালতে শরিয়াহ আইনে বিচার চেয়ে আবেদন করে।
- আপিল আদালত সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে তার সাজা পরিবর্তন করে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে।
আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শ্রীলঙ্কা চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সৌদি আরবে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিনিধি দলের সদস্য উপুল কুমারাপ্পেরুমা জানান, সৌদি আরবের দুটি আইনি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে মামলাটি পরিচালনা করছে। তাদের সঙ্গে মামলার পরবর্তী করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এদিকে, গত ২৮ সেপ্টেম্বরের পর থেকে আনোজানের পরিবারের সঙ্গে তার আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। বন্দি অবস্থায় ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় তার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবার বিষয়টি দূতাবাসকে জানিয়েছে। শ্রীলঙ্কার কিছু ব্যক্তি তার ভাইয়ের কর্মস্থলে ই-মেইল পাঠানোর পর বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। পরে প্রতিষ্ঠানটি সৌদি কর্তৃপক্ষকে জানালে আনোজানের বিরুদ্ধে মামলা হয়। শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আনোজানকে সহায়তার জন্য তারা সব ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশের কারণে এমন কঠোর সাজার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। এর আগে ২০২৩ সালে মোহাম্মদ আল-গামদি নামক এক সৌদি নাগরিককে একইভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও পরে তা কমিয়ে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্যমতে, সৌদি আরবে প্রায় এক কোটির বেশি বিদেশি শ্রমিক কর্মরত। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার মতে, ভাষাগত সীমাবদ্ধতা ও আইনি প্রতিনিধিত্বের অভাবের কারণে স্বল্প আয়ের অভিবাসী শ্রমিকরা দেশটির বিচার প্রক্রিয়ায় অনেক সময় বাড়তি ঝুঁকির সম্মুখীন হন। সৌদি কর্তৃপক্ষ এখনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো সময়সূচি প্রকাশ করেনি। গ্রেফতারের পর তার ব্যক্তিগত ডিভাইস জব্দ করা হয় এবং সৌদি কর্তৃপক্ষ তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোও মুছে দেয়।
সূত্র: Probash Khabor







