রাজধানীর খিলক্ষেতের বাসিন্দা ৩৯ বছর বয়সী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এনামুল হাসান উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
বছরখানেক আগে বিদেশ যাওয়ার জন্য সাড়ে ১১ লাখ টাকা খুইয়েও দমে যাননি তিনি। পরবর্তীতে নিকুঞ্জ এলাকার একটি এজেন্সির মাধ্যমে স্পেনে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। ৭ অক্টোবর রাতে সেই এজেন্সির সাথে চুক্তির অংশ হিসেবে তিনি বাসা থেকে বের হন। কিন্তু তাকে স্পেনে না পাঠিয়ে কৌশলে বিভিন্ন দেশ ঘুরিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করা হয়েছে। বছরখানেক আগে দালালের কথায় বিশ্বাস রেখে সাড়ে ১১ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হন। বিদেশ যাওয়ার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা তার আগ্রহ কাজে লাগিয়ে স্পেনে কর্মসংস্থানের নামে ফাঁদ পাতে। ৭ অক্টোবর বাসা থেকে বেরিয়ে বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ওই চক্রের কবলে রয়েছেন এনামুল হাসান। বুধবার সন্ধ্যায় এই প্রতিবেদন লেখার সময়ও ভুক্তভোগী যুবকের স্ত্রীকে বার্তা পাঠিয়ে এমএফএস নম্বরে টাকা দাবি করে। অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরের সঙ্গে মৌখিক চুক্তিতে স্পেনে যাওয়ার উদ্দেশে ৭ অক্টোবর রাতে খিলক্ষেতের বাসা থেকে বের হন এনামুল হাসান। পরে তিনি মোবাইলে জানান, তিনি দুবাইয়ে আছেন এবং সেখান থেকে মরক্কো হয়ে তাকে স্পেনে নেওয়া হবে।
ভুক্তভোগীর স্ত্রী হেপি আক্তার জানান, বর্তমানে চক্রটি তাকে লিবিয়ায় আটকে রেখে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করছে। শুরুতে ১৯ লাখ টাকা চাওয়া হলেও পরবর্তীতে তা কমিয়ে সাড়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। চক্রটি তাকে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আপাতত ২ লাখ টাকা পাঠানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। তারা মুক্তিপণের টাকা নেওয়ার জন্য দেশীয় মোবাইল ব্যাংকিং ও বেসরকারি ব্যাংকের একাধিক অ্যাকাউন্ট নম্বরও প্রদান করেছে। তারা মামলাও গ্রহণ করেনি। পরবর্তীতে ১৫ ও ১৬ অক্টোবর অভিযুক্তরা একাধিক মোবাইল নম্বর থেকে ফোন করে এনামুলকে ছাড়াতে ১৯ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। এরপর ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় অপর একটি নম্বর থেকে ফোন করে ফের ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাবি করে হুমকি দেওয়া অব্যাহত রাখা হয়।
এ ঘটনায় হেপি আক্তার খিলক্ষেত থানায় জাহাঙ্গীর, রিয়াজ, হারুন ও সায়মন নামে চারজনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তবে অভিযোগের মূল বিষয়বস্তু এড়িয়ে পুলিশ একে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিবদ্ধ করেছে। জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এনামুল তেঁতুলতলা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়েছেন। অথচ পরিবার শুরু থেকেই অপহরণ ও জিম্মি হওয়ার বিষয়টি প্রশাসনকে জানিয়ে আসছে।
ভুক্তভোগীর চাচা জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ করে বলেন, খিলক্ষেত থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাইদুর রহমান উল্টো তাদের ওপর জিডি তুলে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন। তিনি পরিবারকে থানায় ডেকে নিয়ে অপহরণকারীদের সাথে সমঝোতা করে টাকা দিয়ে ভুক্তভোগীকে ছাড়িয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন। এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তারা চরম হতাশ ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। পরিবারের অভিযোগ, এনামুলকে উদ্ধারে পুলিশের ভূমিকা নির্বাক দর্শকের মতো। এ ছাড়া মঙ্গলবার মধ্যরাতে অডিও বার্তার মাধ্যমে তার স্বামীকে দিয়ে জিডি তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দেয়।
ভুক্তভোগীর পরিবার জানায়, অপহরণকারীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তারা নিয়মিত হুমকি দিচ্ছে এবং অভিযোগ প্রত্যাহার না করলে পরিণাম খারাপ হবে বলে ভয় দেখাচ্ছে। অপহরণকারী চক্রটি বাংলাদেশের নম্বর ব্যবহার করে সরাসরি ভুক্তভোগীর স্ত্রীর ফোনে কল দিচ্ছে, কিন্তু পুলিশ আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে তাদের অবস্থান শনাক্ত করার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। উলটো অভিযোগ প্রত্যাহার করে চক্রের সঙ্গে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছে।
এই বিষয়ে এসআই সাইদুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রশ্ন শুনেই ফোন কেটে দেন। এরপর একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি সাড়া দেননি। এছাড়া খিলক্ষেত থানার ওসিসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আবার টাকা দিলেই যে মানুষটাকে নিরাপদে ফেরত পাওয়া যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
নিজের স্বামীর জীবন বাঁচাতে হেপি আক্তার প্রশাসনের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, পুলিশ যতই চাপ প্রয়োগ করুক, তিনি অভিযোগ প্রত্যাহার করবেন না। যেকোনো মূল্যে এনামুল হাসানকে জীবিত উদ্ধারের দাবি জানান তার পরিবারের সদস্যরা। এদিকে অপহরণকারী চক্রটি টাকা না পেলে তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে প্রতিনিয়ত বার্তা পাঠাচ্ছে বলে জানান তিনি।
সূত্র: যুগান্তর








