৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাল বৈশ্বিক ঋণ, বাংলাদেশ ৪৫তম

প্রকাশ:

বিশ্বজুড়ে সরকার, পরিবার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে মোট ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। মাথাপিছু হিসাবে এই ঋণের বোঝা এখন বিশ্বের প্রতিটি মানুষের ওপর প্রায় ৪৪ হাজার ডলার। উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো থেকেই মূলত এই ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে। যেমন—১০ বছর মেয়াদি বন্ড হলো এমন একটি ঋণ, যা সরকারকে ১০ বছর পর পরিশোধ করতে হয়। বন্ড কেনার বিনিময়ে সরকার ক্রেতাদের সুদ দেয় এবং নির্দিষ্ট তারিখে ঋণের পুরো অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

ঋণের এই পাহাড়সম বোঝার ফলে সুদ পরিশোধের খরচও বহুগুণ বেড়েছে। গত এক বছরে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো সরকারি বন্ডের সুদ মেটাতেই ব্যয় করেছে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই অঙ্ক বিশ্বের বার্ষিক সামরিক খাতের খরচ (৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের বিনিয়োগ (২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার) এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের ব্যয়ের (২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার) চেয়েও বেশি। বিশ্বে সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে যুক্তরাজ্য চতুর্থ।

ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের বাড়তি ব্যয় হওয়ার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জনসেবামূলক খাতে। চলমান অস্থিরতা ইউরোপের দেশগুলোর সরকারের আর্থিক সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। ঋণের সুদ মেটাতে সরকারের বাড়তি ব্যয় হওয়ায় স্কুল, হাসপাতাল ও পেনশনের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ কমছে—এমন দাবি করছে বিক্ষোভকারীরা।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পেনশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বরাদ্দ ছাঁটাই করা হচ্ছে বলে অভিযোগ বিক্ষোভকারীদের। একটি দেশ তার ঋণ ব্যবস্থাপনা কতটা দক্ষতার সঙ্গে করতে পারবে, সে বিষয়ে আর্থিক বাজারের আস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক এটি।

জীবনযাত্রার উচ্চমূল্য, আবাসনসংকট এবং মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালের মতো ইউরোপের দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে জনবিক্ষোভ। বিশেষ করে ফ্রান্সে গত শনিবার ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছে, যা শিক্ষাজীবনে ব্যয় বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসনসংকট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাজেট–ঘাটতির প্রতিবাদে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভে নেমেছে লাখো মানুষ। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে ছড়িয়ে পড়া এসব বিক্ষোভে কোথাও কোথাও সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

ফ্রান্সে বর্তমানে সরকারি ঋণের সুদ নেওয়ার খরচ ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আইএমএফ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইউরোজোনের অন্য দেশগুলোর তুলনায় ফ্রান্সকে এখন অনেক বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে, যা গ্রিস বা ইতালির মতো সংকটময় সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। বছরের পর বছর বিপুল ঋণ নেওয়ায় ইউরোপের অনেক দেশই এখন গভীর ঋণসংকটে পড়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সীমাহীন ঋণ নেওয়ার সুযোগ নেই। দেশটির অর্থনীতির তুলনায় ঋণের বোঝা অনেকটাই বেশি, যা জিডিপির ১৩৮ শতাংশ। এতে দেশটির সরকারি অর্থব্যবস্থাকে টেকসই অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। উল্লেখ্য, ২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরোজোনের ঋণসংকটের সময় শুধু গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো সংকটে থাকা দেশগুলোকে ৫ শতাংশ বা তার বেশি সুদ দিতে হয়েছিল। তবে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে তারা বন্ড বিক্রি করে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যানুযায়ী, সরকারি ঋণের শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ঋণের পরিমাণ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা তাদের জিডিপির ১২৭ শতাংশ। বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা মার্কিন ডলারে ঋণ নেওয়ার সুবিধা থাকায় দেশটি সহজে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে পারে। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা চীনের ঋণ ২২ দশমিক ৫০ ট্রিলিয়ন ডলার (জিডিপির ১০৪ শতাংশ) এবং তৃতীয় স্থানে থাকা জাপানের ঋণ ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার (জিডিপির ১৯৯ শতাংশ)। শীর্ষ ঋণগ্রস্ত যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ ৪৫তম। দেশটির ঋণের পরিমাণ ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন, যা দেশটির জিডিপির ১০২ শতাংশ। এই ঋণ দেশটির জিডিপির ১১৮ শতাংশ। সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে আন্তর্জাতিক সহায়তা নিতে হয়েছিল।

বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের ঋণ ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ফ্রান্সের ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। এছাড়া ইতালির ঋণ ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, জার্মানির ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ভারতের ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট ঋণের পরিমাণ ২০৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের জিডিপির ৪০ শতাংশ। আর জার্মানির সরকারি ঋণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ৬৫ শতাংশ। দেশটির ঋণের পরিমাণ ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন, যা দেশটির জিডিপির ৮৩ শতাংশ।

বাংলাদেশের ঋণের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১০ সালে ঋণের পরিমাণ ছিল ৪০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। গত দেড় দশকে তা প্রায় পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের জিডিপির বিপরীতে ঋণের অনুপাত এখনো তুলনামূলক সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে করা হয়।

সরকারগুলো সাধারণত বন্ড বিক্রির মাধ্যমে ঋণ সংগ্রহ করে থাকে। বন্ডের দাম কমলে এর ইল্ড বা মুনাফার হার বেড়ে যায়, যা সরকারের জন্য নতুন ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল করে তোলে। সুদের হার বাড়লে তা কেবল সরকারি বাজেটে প্রভাব ফেলে না, বরং সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ঋণ যেমন—বন্ধকি ঋণ, ক্রেডিট কার্ড ও গাড়ি কেনার ঋণের সুদের হারও বাড়িয়ে দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকারগুলো। কোনো পরিবারের গৃহঋণের সুদ বাড়লে যেমন সংসার খরচে টান পড়ে, সরকারের ক্ষেত্রেও তা–ই হয়।

শেয়ার করুন