দেশের বইয়ের বাজার ও অনলাইন ই-বুক শপগুলোতে উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচারকারী বইয়ের ছড়াছড়ি দেখা দিয়েছে। কোনো প্রকার নজরদারি ছাড়াই ওসামা বিন লাদেন, আল-কায়দা ও আইএস সংশ্লিষ্ট লেখকদের লেখা শত শত বই প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। অনলাইনে অর্ডার দিলে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এসব বই পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এছাড়াও কিছু ওয়েবসাইট ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে বইয়ের পিডিএফ কপি বিক্রি করছে। শুধু অনলাইন নয়, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পূর্ব চত্বরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বইমেলার মতো স্থানেও এসব উগ্রবাদী বই হরহামেশাই পাওয়া যাচ্ছে।
অনলাইনে উগ্রবাদী বই বিক্রির ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে ‘ওয়াফিলাইফ’ নামের একটি ই-বুক পাবলিকেশন। ২০১৫ সালে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি মহাখালী ডিওএইচএস থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তাদের মূল কেন্দ্র আশুলিয়ার গাজিরচটের একটি মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে আছেন রুবায়েত আসিরুল বারী। ওয়াফিলাইফ স্টাইল নামে তাদের একটি মিনি গার্মেন্টসও রয়েছে, যেখানে ইসলামি পোশাক তৈরি হয়। তাদের ওয়েবসাইটে এমন অনেক বই রয়েছে যা অতীতে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের কাছে পাওয়া গিয়েছিল। যেমন, আবু ইয়াহইয়া আল-লিবির ‘শহীদের মর্যাদা চল্লিশ হাদিস’, আবদুল্লাহ আযযামের ‘মুসলিম ভূমির প্রতিরক্ষা করা ঈমান আনার পর প্রথম ফরজ’ এবং জিহাদি মতাদর্শের বই ‘আফগান রণাঙ্গনে’ ও ‘নেদায়ে তাওহিদ’। ২০২২ সালে র্যাপিড একশন ব্যাটালিয়ন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সদস্যদের গ্রেপ্তারের সময় ‘নেদায়ে তাওহীদ’-এর ৪টি কপি উদ্ধার করেছিল, যা জঙ্গিবাদের দিক-নির্দেশনামূলক কিতাব হিসেবে পরিচিত।
বইয়ের তালিকায় ওসামা বিন লাদেনের জীবনীসহ ‘ওসামার সঙ্গে আমার জীবন’, ‘দ্য কিলিং অব ওসামা’, ‘দ্য রোড টু আল-কায়েদা’, ‘কয়েদি ৩৪৫’, ‘জিহাদ সন্ত্রাস না রহমত’ এবং ‘গজওয়াতুল হিন্দ’-এর মতো উগ্রবাদী বইগুলো অবাধে মিলছে। আইমান আল জাওয়াহিরি, আসেম ওমর, মোল্লা দাদুল্লাহ, শাইখ ইউসুফ আল-উয়াইরি, আসিম আল বারকাওয়ি এবং আহমাদ ফারুকের মতো আল-কায়েদার প্রথম সারির নেতাদের লেখা বইও প্রকাশ করছে আর-রিহাব পাবলিকেশন্স। বাংলাবাজারের ইসলামী টাওয়ারে অবস্থিত এই প্রকাশনার স্বত্বাধিকারী মো. হাবিবুর রহমান শামীম আগে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নেতা জসীমুদ্দীন রাহমানীর বই প্রকাশের দায়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া তথ্যমতে, উগ্রবাদী বই বিক্রির সঙ্গে জড়িত অনেক প্রকাশনী মালিক অতীতে গ্রেপ্তার হলেও ৫ই আগস্টের পর জামিনে বেরিয়ে তারা পুনরায় একই কাজে লিপ্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে ইলমহাউস পাবলিকেশন্সের আসিফ আদনান ২০১৪ সালে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ডিবি কর্তৃক গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। বর্তমানে তার প্রকাশনীতে লাদেনের অনুসারী ও আইএস সংশ্লিষ্ট লেখকদের বই বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বাংলাবাজারের সিয়ান পাবলিকেশনের মালিক আবু তাসমিয়া আহমদ রফিক, যিনি অতীতে ‘জামায়াতুল মুসলিমিন’ নামক গোষ্ঠীর সমন্বয়ক ছিলেন এবং ২০১৯ সালে জঙ্গিবাদের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে ৭ মাস কারাভোগের পর মুক্তি পান, তিনিও এখন জিহাদি বই বিক্রিতে সক্রিয়।
রাজধানীর কওমি মার্কেট এলাকার খান প্রকাশনী, বাংলাবাজারের রুহামা পাবলিকেশন ও সন্দীপন প্রকাশনীতেও উগ্রবাদী সংশ্লিষ্ট বই প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। এসব বইয়ের অনুবাদ, সংকলন ও সম্পাদনায় আরিফ মাহমুদ নামে এক ব্যক্তির সক্রিয় অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে। মোল্লা দাদুল্লাহর ‘সত্যের সন্ধানে সেই যুবক’, আয়মান আল-জাওয়াহিরির ‘আমার দেখা শাইখ ওসামা’, আনওয়ার আল-আওলাকির ‘নবীদের জীবন কাহিনী’ এবং আসেম ওমরের ‘দাজ্জাল: কালো পতাকার চূড়ান্ত শত্রু’-এর মতো সংবেদনশীল ও উগ্রবাদী বইগুলো বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, বিষয়টি পুলিশের নজরে রয়েছে এবং এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সাইবার বিভাগের ডিসিকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিক্রি বেশি হওয়ায় প্রায় প্রতিটি স্টলেই এসব বই পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এটি তৈরি করেন তাদেরই আরেকটি প্রতিষ্ঠান ওয়াফি সলিউশন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যেখানে টুব্বা, টুপি, পাঞ্জাবি বানানো হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মার্কিন ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টারের নথিতে তাকে আল-কায়েদার কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেয়ার জন্য প্রচারণামূলক বার্তা প্রচারকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বইটি সরাসরি জিহাদি মতাদর্শ প্রচারের উপাদান রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তার লেখালেখি পরবর্তী জিহাদি আন্দোলনের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এছাড়া আল-কায়েদা নেতা লাদেনের ‘ওসামার সঙ্গে আমার জীবন, দ্য কিলিং অব ওসামা, দ্য রোড টু আল-কায়েদা, আওঙ্গেজেব: বিতর্কের অন্তরালে, কান্দাহারের পথে, দ্য সিক্রেট ওয়ার ইন অফগানিস্তান, কান্দাহারের ডায়েরি, কয়েদি ৩৪৫, অ্যাম্বাসেডর, দ্য লেডি অব বাগরাম, জেগে ওঠো হে।
সূত্র: মানবজমিন








