দেশের বিস্তৃত নৌপথে নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। জলদস্যুদের কবলে পড়ে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছেন জেলেরা, আর পণ্যবাহী নৌযান থেকে লুট হচ্ছে মূল্যবান মালামাল। চাঁদাবাজির পাশাপাশি অপহরণ, ছিনতাই, মাদক পাচার ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মতো ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্ধ্যা নামার পর দুর্গম চর ও মোহনাগুলোতে চলাচলকারী যাত্রীবাহী ট্রলার, জেলেনৌকা ও কার্গো জাহাজগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।
নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নদীপথে অপরাধ দমনে ১১টি অঞ্চলে কাজ চলছে। বিগত বছরগুলোতে নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে বিভিন্ন অপরাধে মোট ২ হাজার ৮৫টি মামলা হয়েছিল। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩৯৯টিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মামলার সংখ্যা ১ হাজার ৩১৪টি বেড়েছে। এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হত্যা, ডাকাতি, অপহরণ, দস্যুতা ও অপমৃত্যুর ঘটনায় আরও ৫০৫টি মামলা রুজু হয়েছে। গত তিন বছরের এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট মামলার সংখ্যা ৫ হাজার ৯৮৯টিতে দাঁড়িয়েছে। আগের দুই বছরের উল্লিখিত সব শ্রেণির মামলা এবং চলতি বছরের ৯ মাসের এই ৫ শ্রেণির মামলা মিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ হাজার ৯৮৯। পরে ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে নৌ পুলিশ। একপর্যায়ে আত্মরক্ষার্থে রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে রানা ও সাজ্জাদ নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছিনতাই ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। সেখানে মামলা ৪৪৮ থেকে বেড়ে হয় ৬১১টি।
নদীপথে সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে ভোলায় ঘটে যাওয়া এক ঘটনায়
- গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি রাতে ভোলা সদর উপজেলার পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের কাছে মেঘনা নদীতে জলদস্যুদের গুলিতে মো. হোসেন (৩০) নামের এক জেলে নিহত হন।
- একই ঘটনায় গুলিতে আহত হন আব্বাস (৩২), কাঞ্চন (৩৪) ও সোহেল (২৯) নামের আরও তিন জেলে।
- তাঁদের সবার বাড়ি ভোলা সদর উপজেলার বাঘার হাওলা গ্রামে।
পুলিশ জানায়, ওই রাতে জেলেদের ট্রলারে ডাকাতির চেষ্টা করে একদল জলদস্যু। জেলেরা প্রতিহত করতে চাইলে তাঁদের ওপর গুলি চালানো হয়। এছাড়া বড় ধরনের অপরাধের মধ্যে রয়েছে নরসিংদীর মেঘনায় বাল্কহেড থেকে ৩১৭ মেট্রিক টন সার ডাকাতি এবং চাঁদপুরের হাইমচরে এমভি আল-বাখেরার সাত কর্মচারীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করার মতো নৃশংস ঘটনা। গত বছরের ১০ অক্টোবর নরসিংদীসংলগ্ন মেঘনা নদীতে একটি বাল্কহেড থেকে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার বস্তা বা ৩১৭ মেট্রিক টন সার ডাকাতি করে দুর্বৃত্তরা। এর আগে ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর চাঁদপুরের হাইমচরে মেঘনা নদীতে সারবাহী জাহাজ এমভি আল-বাখেরার সাত কর্মচারীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। স্রোতে ভাসে অপরাধের চিহ্ন, পচন ধরে মরদেহে।
বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম মল্লিকের মতে, চাঁদপুরের হাইমচর ও শরীয়তপুরের লক্ষ্মীচরের মতো দুর্গম নদীপথে সন্ধ্যার পর দস্যুতার আতঙ্ক বাড়ে। তিনি জানান, মা ইলিশ রক্ষায় যখন অভিযান চলে, তখন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। কিন্তু অভিযান শেষে জেলেরা পুনরায় নামলে আবারও ঝুঁকির মুখে পড়েন। নৌ পুলিশের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সন্ধ্যা নামলেই নদীপথে আতঙ্ক বাড়ে। সাধারণত সন্ধ্যার পর চাঁদপুরের হাইমচর, শরীয়তপুরের লক্ষ্মীচর ও কাঁচিকাটা, মুন্সিগঞ্জের পদ্মা-মেঘনার মোহনা ও সংলগ্ন চরাঞ্চল, লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসংলগ্ন মেঘনা এবং বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জসংলগ্ন মেঘনার চরাঞ্চলে এসব হামলা হয়। এতে জেলে, নৌযানের চালক ও যাত্রীরা সন্ধ্যার পর আতঙ্কে থাকেন। মৎস্যজীবীদের জানমালের নিরাপত্তায় তখনো কোস্টগার্ড ও পুলিশের টহল জোরদার রাখা দরকার। তাঁর মতে, জেলার সীমানাসংলগ্ন নদীপথ ও প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে টহল বাড়ালে এসব অপরাধ কমবে।
নৌযানে চাঁদাবাজির অভিযোগও ব্যাপক। বাল্কহেড মালিক সমিতির সহসভাপতি আহমাদুল কবির মোল্লা জানান, মানিকগঞ্জের হরিরামপুর, ভোলার ইলিশা এবং সাভারের রুস্তমপুর ও আমিনবাজারে পণ্যবাহী নৌযান থেকে নিয়মিত চাঁদা দাবি করা হয়। গত বছরের ৭ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের মেঘনায় চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় বাল্কহেডের শ্রমিকদের ওপর হামলা চালানো হয়। খবর পেয়ে চালিভাঙ্গা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা উদ্ধার করতে গেলে চাঁদাবাজদের হামলার শিকার হন এএসআই মাকসুদ এবং কনস্টেবল সোহাগ ও সাইদুর। চাঁদা না দিলে হামলা, আক্রান্ত পুলিশও। বাংলাদেশ বাল্কহেড মালিক সমিতির সহসভাপতি আহমাদুল কবির মোল্লা বলেন, মানিকগঞ্জের হরিরামপুর সংলগ্ন নদীতে পণ্য বোঝাইয়ের সময় প্রতিটি নৌযান থেকে ২ হাজার টাকা, ভোলার ইলিশায় ৫০০ টাকা এবং সাভারের রুস্তমপুর ও আমিনবাজারে আড়াই হাজার টাকা করে টোলের নামে চাঁদা নেওয়া হয়। গত বছরের ৭ অক্টোবর সকালে নারায়ণগঞ্জে মেঘনা নদীতে টেঁটা, বল্লম, রামদাসহ দেশি অস্ত্র নিয়ে নৌযান থামিয়ে চাঁদা দাবি করে একটি সংঘবদ্ধ দল। তিনি বলেন, নদীতে চাঁদাবাজির অভিযোগ করলেও কেউ চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা করেন না। খুলনার নদ–নদী থেকে এক বছরে ৫০ লাশ উদ্ধার।
নৌ পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম স্বীকার করেছেন যে, চাঁদাবাজি প্রতিরোধে মামলা ও সাক্ষ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা রয়েছে। এছাড়া অবৈধ বালু উত্তোলন ও অপরাধ দমনে অভিযানে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা ঘনঘন হামলার শিকার হচ্ছেন। গত ২১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার হরিপুরে পদ্মা নদীতে অভিযানে গিয়ে পাবনার লক্ষ্মীকুণ্ডা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পাঁচ সদস্য গুলিবিদ্ধ হন। এ ছাড়া ১৯ আগস্ট পিরোজপুরের কাউখালীতে কর্তব্যরত পাঁচ পুলিশ সদস্য দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাত ও ইটের আঘাতে আহত হন। এই চাঁদাবাজি বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চান তিনি।
বর্তমানে দেশে ১২৪টি নৌ পুলিশ ফাঁড়ি কাজ করছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলার পরিসংখ্যানের বাইরেও অনেক অপরাধ থেকে যায়।
অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুকের মতে, নদীকেন্দ্রিক অপরাধের প্রবণতা বাড়ায় শুধু পাহারা নয়, নজরদারি ও তত্ত্বাবধান জোরদার করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, স্থলপথের তুলনায় দীর্ঘ নৌপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি কম থাকায় অপরাধীরা এই পথ বেছে নিচ্ছে।
নৌ পুলিশের প্রধান জানিয়েছেন, অপরাধীদের ডেটাবেজ তৈরি করে এবং স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
অঞ্চলভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি মামলার ঘটনার তালিকায় চাঁদপুর ও বরিশাল শীর্ষে অবস্থান করছে, যা নদীপথের নিরাপত্তার সংকটের বিষয়টি স্পষ্ট করে দেয়। দুই বছরই মামলার সংখ্যায় এরপর ছিল বরিশাল অঞ্চল।
সূত্র: প্রথম আলো








