ফ্রান্সে চলমান ব্যাপক সহিংসতা ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার প্রথমবারের মতো পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি সামরিক বাহিনী মোতায়েনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ১৭ অক্টোবর থেকে প্যারিস, মার্সেই এবং লিওঁসহ দেশের বিভিন্ন শহরে যে ধরনের লুটপাট ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে, তা মোকাবিলায় এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী শনিবার দেশটিতে নতুন করে বড় ধরনের বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে, যা মাথায় রেখেই সরকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা বহুগুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। বিভিন্ন শহরের কেন্দ্রস্থল অরক্ষিত থাকার কারণে সরকারের কৌশল নিয়ে চারদিকে তীব্র সমালোচনা হচ্ছিল। এর জবাবে নিজেদের রণকৌশল পুরোপুরি ঢেলে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে প্রশাসন।
পার্লামেন্টের এক উত্তপ্ত বিতর্কে অংশ নিয়ে ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি সেনাবাহিনী পুলিশের সহযোগী হিসেবে মাঠে থাকবে। সহিংসতার ব্যাপকতা এবং তা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের প্রাথমিক ব্যর্থতার বিষয়টি পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি এবং পুলিশের মোতায়েন প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা ছিল সরকারের বড় ভুল। বিশেষ করে, পুলিশ কর্মকর্তাদের পূর্বনির্ধারিত ছুটি বাতিল না করার বিষয়টি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
ভুল স্বীকার করে লরাঁ নুনেজ বলেন, সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতির জন্য তিনি গভীরভাবে অনুতপ্ত এবং এর দায়ভার সম্পূর্ণ নিজের কাঁধেই নিচ্ছেন। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু চলমান এই সংকটকে ‘সহিংসতা বনাম প্রজাতন্ত্রের’ লড়াই হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সরাসরি এর জন্য অতি-বামপন্থী দলগুলোকে দায়ী করেছেন। তবে পাল্টা অভিযোগ তুলে বিরোধী দলগুলো বলছে, জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধা হ্রাসের কারণে জনগণের যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে, সরকার তা বরাবরই উপেক্ষা করে আসছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ কারফিউ জারি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরদের লক্ষ্য করে জারি করা এই বিশেষ কারফিউ গত মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। সরকারের দাবি, এই কঠোর পদক্ষেপ পরিস্থিতি শান্ত করতে বেশ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। গতকাল মঙ্গলবার সরকারের পক্ষ থেকে এ পদক্ষেপের কথা জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য। সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত বেশ কিছু এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারফিউ জারির পর ফ্রান্সে একটি তুলনামূলক শান্ত রাত কেটেছে।
আগামী বছর ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এমন সময়ে এই অস্থিতিশীলতা রাজনৈতিক উত্তাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যেখানে জনমত জরিপে কট্টর ডান ও বামপন্থী প্রার্থীরা বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
ফ্রান্সের এই গণক্ষোভ শুধু দেশের সীমানাতেই সীমাবদ্ধ নেই; ইতালি ও আলবেনিয়াসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশও একই ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে হিমশিম খাওয়া ইউরোপের অধিকাংশ দেশে জীবনযাত্রার মান নিয়ে সাধারণ মানুষের এই অসন্তোষ পুরো মহাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সহিংস আন্দোলনের পর ফ্রান্সের সামনে কী ঘটতে পারে। ইউরোপের দেশে দেশে কেন বিক্ষোভ করছেন মানুষ।
সূত্র: প্রথম আলো








