মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রেকর্ড গড়লেন মুসলিম ও সংখ্যালঘু প্রার্থীরা

প্রকাশ:

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে দেশটির রাজনীতিতে একাধিক ঐতিহাসিক অর্জনের সাক্ষী হয়েছে সাধারণ মানুষ। প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় ফিলিস্তিনি ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম প্রতিনিধিদের জয় মার্কিন রাজনীতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের পথ উন্মোচন করেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসসহ বিশ্বের একাধিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এসব প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করেছে। তার পুনর্নির্বাচন মার্কিন কংগ্রেসে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখল।

প্রথম মুসলিম সিনেটর আবদুল আল-সাইয়েদ

মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে ইতিহাস গড়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ। তাঁর এই বিজয়ের মাধ্যমে মার্কিন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো মুসলিম সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। ৪২ বছর বয়সী আল-সাইয়েদ পেশায় একজন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তিনি পূর্বে মিশিগানের ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক এবং ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া এই রাজনীতিক শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন।

নির্বাচনী প্রচারে আল-সাইয়েদ জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সাথে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের তীব্র সমালোচনা করে তিনি মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। প্রচার চলাকালে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ রিপাবলিকান শিবিরের অনেকের কাছ থেকেই তাঁর মুসলিম পরিচয় নিয়ে নানা ধরনের ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ও রাজনৈতিক আক্রমণ সামনে আসে। তবে সব বাধা অতিক্রম করে তিনি এই জয় ছিনিয়ে নেন।

নিউ জার্সির কংগ্রেসে প্রথম মুসলিম প্রতিনিধিত্ব

নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আদম হামাওয়ি রিপাবলিকান প্রার্থী গ্রেগ মেলেকে হারিয়ে জয়লাভ করেছেন। এই জয়ের ফলে তিনি নিউ জার্সি থেকে প্রতিনিধি পরিষদে যাওয়া প্রথম মুসলিম প্রার্থী হলেন। মিসরীয় বংশোদ্ভূত হামাওয়ি একজন প্লাস্টিক ও পুনর্গঠনমূলক সার্জন এবং সাবেক মার্কিন সেনা চিকিৎসক। আসনটি আগে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

ইরাক যুদ্ধে দায়িত্ব পালনের সময় আহত সেনাদের চিকিৎসায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন হামাওয়ি। পরবর্তীতে তিনি বসনিয়া, সুদান, লেবানন ও সিরিয়ায় মানবিক চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন। এমনকি ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় গিয়ে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সেবা দেন। তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, ইসরায়েলকে মার্কিন সহায়তা প্রদান বন্ধ এবং চিকিৎসা ও শিক্ষাঋণ বাতিলের প্রতিশ্রুতি গুরুত্ব পেয়েছিল।

ইলিনয়ে নাবিলা সৈয়দ ও অন্যান্য মুসলিম প্রার্থীদের জয়

ইলিনয় সিনেটের ২৬তম ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান ডারবি হিলসকে পরাজিত করে বড় জয় পান ডেমোক্র্যাট নাবিলা সৈয়দ। প্রাপ্ত ভোটের মধ্যে তিনি একা পেয়েছেন ৫৭ শতাংশ ভোট, বিপরীতে হিলস পান ৪৩ শতাংশ ভোট। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই মুসলিম নারী ২০২২ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ইলিনয়ের প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় উঠে এসেছিলেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান স্পষ্ট হবে।

অন্যদিকে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিনেটের ১২তম ডিস্ট্রিক্ট থেকে ইতিহাস তৈরি করেছেন আবের কাওয়াস। তিনি নিউইয়র্ক রাজ্য সিনেটে প্রথম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মুসলিম নারী হিসেবে জয়ী হলেন। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি এবং ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সমর্থনে কাওয়াস নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নেন। তিনি মূলত আবাসন অধিকার, ভাড়াটিয়া সুরক্ষা এবং অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় কাজ করার ঘোষণা দেন। এবার সিনেটে নির্বাচিত হয়ে অঙ্গরাজ্যের আইন প্রণয়নে আরও বড় পরিসরে ভূমিকা রাখার সুযোগ পাচ্ছেন তিনি। কুইন্সের বাসিন্দা কাওয়াস একজন কমিউনিটি সংগঠক।

আইনসভায় রুয়া রোমান, ইলহান ওমর, রাশিদা তালিব ও আন্দ্রে কারসন

  • রুয়া রোমানজর্জিয়ার রাজ্য আইনসভায় ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত প্রতিনিধি রুয়া রোমানের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। ২০২২ সালে তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি হিসেবে উক্ত রাজ্য আইনসভায় নির্বাচিত হন।
  • ইলহান ওমরমিনেসোটার ৫ম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে আবারও কংগ্রেস সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট ইলহান ওমর। সোমালীয় বংশোদ্ভূত এই নারী মার্কিন কংগ্রেসের প্রথম দুই মুসলিম নারীর একজন।
  • রাশিদা তালিবমিশিগানের ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট রাশিদা তালিব। ২০১৮ সালে প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান নারী হিসেবে তিনি ইতিহাস গড়েছিলেন।
  • আন্দ্রে কারসনইন্ডিয়ানার ৭ম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পুনর্নির্বাচিত হন ডেমোক্র্যাট আন্দ্রে কারসন। ২০০৮ সালের বিশেষ নির্বাচনে প্রথম বিজয়ী হওয়া কারসন দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্ব করছেন। তিনি প্রতিনিধি পরিষদের গোয়েন্দাবিষয়ক স্থায়ী কমিটিতে নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ দমন ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

কৃষ্ণাঙ্গ, আদিবাসী ও এলজিবিটিকিউ প্রতিনিধিদের ইতিহাস

নিউ মেক্সিকোর গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ডেব হাল্যান্ড রিপাবলিকান প্রার্থী গ্রেগ হালকে পরাজিত করে দেশের প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন। পাশাপাশি জর্জিয়ার গভর্নর নির্বাচনে রিপাবলিকান রিক জ্যাকসনকে হারিয়ে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট কেইশা ল্যান্স বটমস।

ফ্লোরিডার গভর্নর নির্বাচনে বড় ধরনের চমক দেখিয়ে জয়লাভ করেছেন রিপাবলিকান প্রার্থী বায়রন ডোনাল্ডস। এর মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো রাজ্যের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিকান গভর্নর হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন। এছাড়া ইলিনয় থেকে ডেমোক্র্যাট জুলিয়ানা স্ট্র্যাটন বিজয়ী হয়ে সিনেটে রাজ্যটির দ্বিতীয় কৃষ্ণাঙ্গ নারী সদস্য হিসেবে প্রবেশ করছেন। তিনি বিদায়ী সিনেটর ডিক ডারবিনের পদে স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ফলাফল

নিউ হ্যাম্পশায়ারের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ক্রিস পাপাস সাবেক রিপাবলিকান সিনেটর জন ই. সুনুনুকে পরাজিত করেছেন। পাপাস মার্কিন রাজনীতির ইতিহাসে প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হলেন। এর আগে ২০১৮ সালে তিনি নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে প্রথম এলজিবিটিকিউ প্রতিনিধি হিসেবে কংগ্রেসে স্থান পান।

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন আইল্যান্ডসের গভর্নর নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ইতিহাস গড়েছেন স্টেসি প্লাসকেট।

তিনি মূল ভূখণ্ডের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অধিভুক্ত অঞ্চল থেকে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হলেন। আলাস্কায় ডেমোক্র্যাট মেরি পেলটোলা রিপাবলিকান প্রার্থী ড্যান সুলিভানের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন এবং প্রাথমিক গণনায় এগিয়ে আছেন। অন্যদিকে মিনেসোটা রাজ্যের নতুন ইতিহাস গড়ে প্রথম নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট অ্যামি ক্লোবুচার। ২০২৬ সালের এই মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ৬.স্টেসি প্লাসকেট—যুক্তরাষ্ট্রের অধিভুক্ত অঞ্চলের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর।

শেয়ার করুন