সন্দ্বীপে তরুণদের স্বেচ্ছাশ্রমে সচল নিরাপদ নৌ-যাতায়াত ব্যবস্থা

প্রকাশ:

জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ নৌপথের যাত্রী পরিবহনের মূল দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) সময়সূচি জানানোর বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয় না। দাপ্তরিক এই চরম গাফিলতির ফলে যাত্রীরা আগেভাগে জানতে পারেন না কখন নৌযান ছাড়বে, আর কখন বন্ধ থাকবে। তথ্যের এই ঘাটতির কারণে অনেক সময় ঘাটে এসে সি-ট্রাক বা ফেরি না পেয়ে যাত্রীদের ফিরে যেতে হয়, কিংবা বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনিরাপদ স্পিডবোট বা ট্রলারে যাতায়াত করতে হয়। জোয়ার-ভাটার কারণে কখন জাহাজ ছাড়বে, তা ঘাট থেকে কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারত না। অনেক সময় ঘাটে পৌঁছানোর আগেই জাহাজ ছেড়ে যেত। তখন বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্পিডবোটে উঠতে হতো। তখনই অনুভব করি, যাত্রীদের যদি আগে থেকে সময়সূচি জানানো যায়, তবে তারা কোনো ভোগান্তি ছাড়াই নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারবেন। জোয়ার-ভাটার সঠিক সময়সূচি না জানার কারণে সেদিন হাঁটু পানি মাড়িয়ে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল।

সন্দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিআইডব্লিউটিসির কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে ‘যাত্রী সংকট’-এর অজুহাত দেখিয়ে পরিকল্পিতভাবে সরকারি নৌযান প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে মুনাফালোভী একটি চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, তথ্যের অভাবে যাত্রী না হওয়ার অজুহাতে গত অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে সন্দ্বীপ রুট থেকে আধুনিক সি-ট্রাক ‘এসটি নিঝুম দ্বীপ’ সরিয়ে নেওয়া হয়। গুপ্তছড়া-কুমিরা ও বাঁশবাড়িয়া-গুপ্তছড়া রুটে বর্তমানে বিআইডব্লিউটিসির সি-ট্রাক ‘খিজির’ ও ফেরি ‘কপোতাক্ষ’ চলাচল করছে। তবুও বিআইডব্লিউটিসির সেই মুখস্থ বুলি—‘যাত্রী সংকট’।

কর্তৃপক্ষের এমন উদাসীনতায় দ্বীপের মানুষের যখন চরম ভোগান্তি হচ্ছিল, ঠিক তখনই তরুণ স্বেচ্ছাসেবীরা নিজ উদ্যোগে তথ্য সরবরাহের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। সন্দ্বীপের বাসিন্দা ও নিয়মিত যাত্রী নিয়াজ মাহমুদ জানান, আগে ঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হতো, কিন্তু এখন ফেসবুক পেজগুলো থেকে আগের রাতেই জাহাজের সঠিক সময়সূচি জেনে নিতে পারছেন। এতে সময় ও ভোগান্তি দুটোই কমছে। তবে কর্তৃপক্ষের তৈরি করা এই কৃত্রিম সংকট রুখে দিতে জন্মস্থানের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এগিয়ে এসেছেন দ্বীপটির একঝাঁক তরুণ স্বেচ্ছাসেবী।

সরেজমিনে দেখা যায়, সন্দ্বীপভিত্তিক একাধিক ফেসবুক পেজের অ্যাডমিনরা প্রতিদিন ঘাটে গিয়ে ফেরি ও সি-ট্রাকের সময়সূচি সংগ্রহ করছেন।

এরপর জোয়ার-ভাটার তথ্যের সঙ্গে তা মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে। এই উদ্যোগের সুফল হিসেবে প্রতিটি নৌযানে এখন পর্যাপ্ত যাত্রী মিলছে। সি-ট্রাক ‘এসটি নিঝুম দ্বীপ’-এর ক্যাপ্টেন একরামুজ্জামান জানান, এই নৌরুটে যুক্ত হওয়ার পর জাহাজটি রেকর্ডসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করেছে। দাপ্তরিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১২ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত এসটি নিঝুম দ্বীপ সর্বমোট ৪ হাজার ৬৬২ জন যাত্রী পরিবহন করেছে।

ফেসবুক পেজ ‘ট্রাভেলার্স আইস’-এর অ্যাডমিন মাকসুদুর রহমান জানান, দুই বছর আগে জাহাজের জন্য পাঁচ ঘণ্টা বসে থাকার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি যাত্রীদের তথ্য দেওয়ার এই পরিকল্পনা করেন। ‘সন্দ্বীপ সংযোগ’-এর অ্যাডমিন ফছিহুল আলম বলেন, সন্দ্বীপের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তারা কাজ করছেন এবং মানুষের কাছে নিরাপদ নৌযানের গুরুত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। এছাড়া খাদেমুল ইসলামসহ অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী তরুণরা জানান, স্থানীয় জনগণের দুর্ভোগ দেখে তারা আর চুপ থাকতে পারেননি।

সন্দ্বীপ টিভি, সন্দ্বীপের কণ্ঠস্বর, চারু মিল্লাত, দ্বীপের চোখ, আরপিএল টিভি ও সন্দ্বীপ টুডেসহ বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ এখন নিয়মিত এই সেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তরুণদের এই স্বেচ্ছাশ্রমের কারণে বিপুল আর্থিক লোকসান থেকে রক্ষা পেলেও বিআইডব্লিউটিসির পক্ষ থেকে তেমন কোনো কৃতজ্ঞতা মেলেনি বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন অ্যাডমিনরা।

তরুণদের এমন অভিযোগের বিপরীতে বিআইডব্লিউটিসির সহ-মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) কে এম এমরান জানান, সন্দ্বীপ রুটে জাহাজের শিডিউল সম্পূর্ণ জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল, যা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। এই কারণে কেন্দ্রীয় বা দাপ্তরিকভাবে আগাম সময়সূচি নিয়মিত প্রচার করা তাদের জন্য কিছুটা জটিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। এখন শিডিউল দেখেই বাড়ি থেকে বের হতে পারি।

শেয়ার করুন