রাশিয়ায় যুদ্ধের টোপে প্রতারিত বাংলাদেশিরা, ফিরতে চান আহতরা

প্রকাশ:

উন্নত জীবনের আশায় রাশিয়ায় গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন বাংলাদেশিরা। গেলেই ইউক্রেনের ড্রোনের হামলার শিকার হতে হয়। রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরু হয় ২০২২ সালে ফেব্রুয়ারিতে। বাংলাদেশ থেকে ২০২৩ সালে রাশিয়ায় কর্মী যাওয়া শুরু হয়।

চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁদের জোরপূর্বক রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতায় অনেকেরই জীবন বিপন্ন। একপর্যায়ে তাঁদের দলের বাকি ১১ জনও যোগ দেন।

রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পেনজা শহরের একটি হাসপাতালে গত ১ মাস ১০ দিন ধরে চিকিৎসাধীন রয়েছেন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার মো. আলী হাসান। এরপর মাইলের পার মাইল হেঁটে, সঙ্গে থাকা শুকনো খাবার খেয়ে তিন দিন পর এক সুড়ঙ্গে পৌঁছান।

যুদ্ধে আহত হয়ে হাসপাতালের শয্যায় কাতরাচ্ছেন তিনি। ‘আমাদের যুদ্ধে পাঠায় দিচ্ছে, আমার মাকে দেখে রাখিস’।

নিজের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে আলী হাসান বলেন, এটি কোনো জীবন নয়।

তিনি বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, সেখান থেকে সুস্থ হলে দেশে পাঠানোর আশ্বাসের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তাঁর আশঙ্কা, সুস্থ হওয়ার পরপরই তাঁকে আবার যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে। আলী হাসান বর্তমানে এতই শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত যে, আগামী এক বছরেও তিনি সুস্থভাবে দাঁড়াতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দিহান। পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য তিনি আর্তনাদ করছেন। গতকাল বুধবার তাঁর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয়। আলী হাসান আরও বলেন, ‘এক বছরে পায়ের ওপর দাঁড়াতে পারব কি না জানি না। কবে দেশে ফিরতে পারব, এই প্রার্থনা করি সারাক্ষণ। যেমনে পারেন, আমারে উদ্ধার করেন; পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেন।’। পরিবারটির শেষ আশা, পবিত্র বেঁচেও থাকতে পারেন।

একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন গোপালগঞ্জের সদর উপজেলার পলাশ শেখ। উন্নত জীবনের আশায় ধারদেনা ও চড়া সুদে ঋণ নিয়ে গত ৭ মে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। সেখানে যাওয়ার পর পরিস্থিতির ভয়াবহ রূপ দেখতে পান তিনি। ড্রোন হামলায় পলাশ তাঁর একটি হাত হারিয়েছেন এবং গত ২৪ দিন ধরে মস্কোর একটি হাসপাতালে ভর্তি আছেন। পলাশের বোন চুমকি খানম গত ২৬ জুলাই প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন, যেখানে ভাইয়ের জীবন রক্ষায় কূটনৈতিক উদ্যোগ ও পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই ধরনের আবেদন করেছিলেন আলী হাসানের স্ত্রী আকলিমা খাতুনও। বিষয়টি জানান পলাশের ফুফাতো ভাই আবু সালেহ ইসলাম।

আহত এই দুজনসহ মোট ৩০ জনের একটি দল গত ৭ মে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে রাশিয়ায় যান। তাঁদের মধ্যে মাত্র পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। পরিবারের ভাষ্যমতে, প্রতারণার মাধ্যমে এই ৩০ জনকে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। আলী হাসান জানান, অস্ত্র হাতে দিয়ে তাঁদের বলা হয় যুদ্ধ করতে হবে না, শুধু সামনে-পিছে যাতায়াত করতে হবে। এই মিথ্যা আশ্বাসকে ‘মরণফাঁদ’ আখ্যা দিয়ে তিনি জানান, নির্দেশ অমান্য করলে মারধর ও বন্দি করে রাখা হয়। ফলে নিরুপায় হয়ে যুদ্ধে যেতে হয়, যেখানে ড্রোন হামলায় প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। এখন পর্যন্ত এই দলটির অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। ৫৪ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও সঠিক সংখ্যাটি অস্পষ্ট। ৬ জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন এবং দুজন পালিয়ে দেশে ফিরেছেন। তিনিসহ ৩০ জনের ১৫ জনের সঙ্গে কথা বলেছে। নিহত ব্যক্তিদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিরা বলছেন, ওই ৩০ জনকে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ১৬ জনের দলে ছিলেন আলী হাসান। ১৬ জনের দল থেকে ১৪ জন নিখোঁজ এখন, আর বাকি ২ জন হাসপাতালে ভর্তি। সেটি মাটির নিচের একটি সেনা ক্যাম্প। তবে অন্তত ৫৪ জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে। এদের অনেকেই গিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন মূলত ‘টোপ’ হিসেবে। মারাও যাচ্ছেন কেউ কেউ, যার সঠিক সংখ্যা জানা যায় না। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা আলাদাভাবে প্রকাশ করা হবে। এদিকে পরিবার ঋণের কিস্তি পরিশোধে পাওনাদারদের চাপে আছে। ‘দুনিয়ায় দেখা না হলে দেখা হবে হাশরের মাঠে’, রাশিয়ায় নিহত বাংলাদেশিদের লাশও দেশে আসে না।

নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো ব্যবস্থা নেই এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো কোনো ক্ষতিপূরণ পায় না। এদিকে মস্কোতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানান, যারা আহত হয়ে হাসপাতালে আছেন, তারা দেশে ফেরার জন্য দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। তবে দূতাবাস কর্তৃপক্ষ বলছে, সুস্থ হওয়ার পর তাদের দেশে পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী মনে করেন, এটি এখন দূতাবাসের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তিনি বলেন, রাশিয়ার সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে এই দুইজনের চিকিৎসার দায়িত্ব দূতাবাসকে নিতে হবে। পাশাপাশি তাঁদের যাবতীয় পাওনা ও ক্ষতিপূরণ আদায় এবং দ্রুত দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

শেয়ার করুন